৭ নম্বর বিপৎসংকেত

ধেয়ে আসছে শক্তিশালী ‘বুলবুল’

* আঘাত হানতে পারে আজ * ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা * ২২ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বাংলাদেশ উপকূলের ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ায় মোংলা ও পায়রায় ৭ নম্বর এবং চট্টগ্রাম বন্দরে ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারি হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারে আগের মতোই ৪ নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর।

আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন জানান, গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় এ ঝড় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। ওই সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়োহাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, আপাতত এর গতিমুখ সুন্দরবনের দিকে। ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসায় সারা দেশে সব ধরনের নৌ-চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান গতকাল জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আজ শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে যেকোনো সময় বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। এ সময় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা পাঁচ থেকে সাত ফুট পর্যন্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রতিমন্ত্রী। বুলবুলের সম্ভাব্য এই হানার মুখে গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রতিমন্ত্রী।

পরে সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সাত জেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে লোক সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ-্রগুলোয় ২০০০ প্যাকেট করে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে উপকূলীয় প্রতিটি জেলার প্রশাসকদের সঙ্গে আমাদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা হয়েছে। গতকাল প্রতিটি জেলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটির সভা হয়েছে। তারা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জেলা উপজেলা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসায় সারা দেশে সব ধরনের নৌ-চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

২২ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট ২২টি মন্ত্রলণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. মো. এনামুর রহমান এ কথা জানিয়ে বলেন, এরই মধ্যে সাইক্লোন শেল্টারসহ উপকূলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সাইক্লোন শেল্টারে দুই হাজার প্যাকেট করে শুকনো খাবার ও নগদ পাঁচ লাখ করে টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাহাজ চলাচল বন্ধ, সেন্টমার্টিনে আটকা ১২০০ পর্যটক

‘বুলবুল’-এর কারণে গতকাল টেকনাফ-সেন্টমার্টিন সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ৩ নম্বর সংকেত ঘোষণার পর বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে নোটিস দেন। জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সেন্টমার্টিনে প্রায় ১২০০ পর্যটক আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর আহমদ। তবে তারা নিরাপদ রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ইউপি চেয়ারম্যান জানান, বৃহস্পতিবার বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনেকে রাত্রিযাপনের জন্য থেকে গেছেন। হঠাৎ বৈরি আবহাওয়ায় জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় তারা আটকে গেছে।

সারা দেশে নৌ-চলাচল বন্ধ

ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসায় সারা দেশে সব ধরনের নৌ-চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপ?রিবহন কর্তৃপ?ক্ষ। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন মজুমদার গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, অভ্যন্তরীণ নৌ-পথে ৪ নম্বর হুশিয়ারি সংকেত জারি হওয়ায় সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে।

‘বুলবুল’ মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে উপকূল

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর কারণে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ঝরছে বৃষ্টি। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় গতকাল ছুটির দিনটিতেও দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো জরুরি সভা করেছে। দুর্যোগ-পরবর্তী চিকিৎসাসেবার জন্য মেডিকেল টিম গঠনসহ দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছে জেলা প্রশাসনগুলো। প্রস্তুত করা হচ্ছে দুর্যোগপ্রবণ এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলো।

বরিশাল ব্যুরো জানায়, ব?রিশালে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মো?কাবিলায় জেলা প্রশাসন ২৩২টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। খোলা হয়েছে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন হলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি সরকারি-বেসরকারি বহুতল ভবন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। গতকাল দুপুরে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমি?টি জরুরি সভায় জেলা প্রশাসক এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।

বরগুনা প্রতিনিধি জানান, জেলা প্রশাসক কার্যালয় গতকাল সকাল ১০টায় এক সভায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। জেলা প্রশাসক মোস্তাইম বিল্লাহর সভাপতিত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থা কমিটির সভায় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়। এতে জানানো হয়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সব উপজেলা প্রশাসনকে সতর্ক রাখা হয়েছে। সাগরে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত সব ট্রলারকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। গতকাল দুপুর ১২টায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সভা জেলা প্রশাসক দরবার হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে জেলার ৪০৩টি সাইক্লোন শেল্টার। আপদকালীন সময়ে শুকনো খাবারসহ এক শ টন চাল, ৩৫০০ কম্বল, ১৬৬ বান্ডিল ঢেউটিন এবং নগদ ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ভোলা প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় ভোলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ঝড় মোকাবিলায় জেলার ৬৬৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। গঠন করা হয়েছ ৯২টি মেডিকেল টিম। এ ছাড়া জেলা সদরসহ সাত উপজেলায় আটটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। মানুষর্কে সতর্ক করতে উপকূলে চলছে রেড ক্রিসেন্ট ও সিপিপির প্রচারণা। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মাসুদ আলম ছিদ্দিক জানান, ঝড় মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১৩ হাজার স্বেচ্চাসেবীকে। সব আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ত্রাণ মজুদ রাখা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে অরেঞ্জ অ্যালার্ট

কলকাতা প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে উপকূলে জারি করা হয়েছে অরেঞ্জ অ্যালার্ট (প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে তিনটি সতর্কতার মধ্যে দ্বিতীয়)। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হয়ে বুলবুল (ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার মাত্রায় সাত ক্যাটাগরির মধ্যে পঞ্চম) ধেয়ে আসছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের দিকে। গতকাল ঘূর্ণিঝড়টি অত্যন্ত শক্তিশালী সাইক্লোনে (ভেরি হেভি সাহক্লোনিক স্টর্ম) রূপ নেয় বলে এক বার্তায় জানিয়েছে ভারতের আবহাওয়া অধিদফতর। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার থেকে ১৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আজ শনিবার এটি ভারত বা বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে বলে জানানো হয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে।

রাসমেলা হচ্ছে না, সুন্দরবনে যাওয়াও বন্ধ

খুলনা ব্যুরো ও বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলের’ প্রভাবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাগেরহাটের দুবলার চরে হতে যাওয়া রাসমেলা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। আজ বিকেল থেকে রাসমেলার দর্শনার্থীদের যাত্রা শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল। এদিন দুপুর নাগাদ মেলায় যাওয়ার অনুমতি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত আসার কথা ছিল। তবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে গতকাল দুপুরেই রাসমেলা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বনবিভাগ। রাসমেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বসু শন্তু এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে ‘বুলবুলের’ কারণে সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

"