কাউন্সিলর বরখাস্তের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

হাসান ইমন

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম এম মমিনুল হক সাঈদকে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল টানা তিন দিন বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকা। এমন অভিযোগ শুধু সাঈদের বিরুদ্ধে নয়, আরো অনেকের বিরুদ্ধে আনা যাবে। জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির আরো ৩০ জন কাউন্সিলর অনুমতি ছাড়া বোর্ড সভায় অনুপস্থি ছিলেন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণের (ডিএসসিসি) ১৪ জন আর উত্তরের (ডিএনসিসি) ১৬ জন। শুধু সাঈদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও বাকিদের বিরুদ্ধে কোনো নোটিসও দেওয়া হয়নি। তবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন আইনে বলা হয়েছে, মেয়র অথবা কাউন্সিলর তার স্বীয় পদ থেকে অপসারণযোগ্য হবেন, যদি তিনি যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিরেকে করপোরেশনের পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন। করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, অন্তত ২৮ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনের একনাগাড়ে তিনটি থেকে ১১টি বোর্ডসভায় অনুপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুমতি তারা নেননি। তাদের মধ্যে ডিএসসিসির ৯ জন ও ডিএনসিসির তিনজন ১০টির বেশি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ডিএসসিসির কয়েকজন ১৯টি সভার মধ্যে মাত্র চার থেকে ছয়টি সভায় উপস্থিত ছিলেন। আর ডিএনসিসির ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম একটি বোর্ড সভায়ও উপস্থিত ছিলেন না। ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ১২ বোর্ডসভার মধ্যে একদিন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আরো তিনজন দুই থেকে তিন দিন বোর্ডসভায় উপস্থিত ছিলেন। এই কাউন্সিলরের অনেকের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো, মদ, জুয়া, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ করপোরেশনের দায়িত্ব পালনেও অনীহার অভিযোগ আছে। কেউ কেউ সরকারের অনুমোদন না নিয়ে একাধিকবার বিদেশেও গেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশন থেকে মন্ত্রণালয়ে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

ডিএনসিসির (২২তম-৩৩তম) বোর্ডসভার মধ্যে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম একদিনও উপস্থিত ছিলেন না। ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন টানা ১১দিন অনুপস্থিত ছিলেন। ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামীম হাসান ১০ দিন অনুপস্থিতির মধ্যে টানা ৭ দিন, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মজিবুর রহমান ২২-২৪ ও ২৮-৩৩তম সভা পর্যন্ত একটানা অনুপস্থিত ছিলেন। ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুর রউফ ৯ দিন অনুপস্থিতির মধ্যে ২৪-৩১তম সভা পর্যন্ত টানা অনুপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ৮ দিন অনুপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি ৩২তম বোর্ডসভার আগেই মারা গেছেন। ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম মানিক ২৫-২৭ ও ২৯-৩১তম বোর্ডসভায় টানা অনুপস্থিতসহ মোট অনুপস্থিত ছিলেন। ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাছির হোসেন (২৩-২৫) টানা তিনসহ মোট ছয় দিন অনুপস্থিত ছিলেন। ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ৩০-৩২তম বোর্ডসভায় টানা তিন দিনসহ মোট ছয় দিন অনুপস্থিত ছিলেন। ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ২৮-৩১তম বোর্ডসভায় টানা চার দিনসহ মোট ছয় দিন অনুপস্থিত ছিলেন। এছাড়া নতুন যুক্ত হওয়া ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোতালেব মিয়া চারটি বোর্ডসভার মধ্যে তিনটিতে অনুপস্থিত ছিলেন। তবে ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান সবকটি বোর্ডসভায় উপস্থিত ছিলেন। সংরক্ষিত ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বেগম মেহেরুন্নেছা হক টানা ২৯-৩২তম সভা পর্যন্ত, ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর খালেদা বাহার বিউটি টানা ২৮-৩০তম, ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলেয়া সরোয়ার ডেইজী টানা ২২-২৫তম সভাসহ মোট পাঁচ দিন অনুপস্থিত ছিলেন। এছাড়া নতুন সংরক্ষিত ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইলোরা পারভীন চারটির মধ্যে টানা তিন দিন অনুপস্থিত ছিলেন।

২০১৫ সালের ২৮ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের পর মোট ১৯টি সভা হয়। এসব সভায় অন্তত ১৭ জন কাউন্সিলর একনাগাড়ে তিনটি সভায় অনুপস্থিত থেকেছেন। এর মধ্যে ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ করপোরেশনে অনুষ্ঠিত ১৯টি সভার মধ্যে মাত্র ছয়টি বোর্ডসভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, সপ্তম থেকে দশম, ১২ থেকে ১৭তম পর্যন্ত মোট ১৩টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মকবুল হোসেন মহসিন টানা ১৫-১৭তমসহ মোট আটবার করপোরেশনের সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আশ্রাফুজ্জামান ৮-১০ ও ১৪-১৮টি সভায় টানা তিন ও পাঁচটি সভাসহ ১০টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদার ১২-১৯তম সভায় টানা সাতটিসহ মোট ১২টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তফা জামান পপি ২-৪ ও ১২-১৬তম সভায় টানা তিন ও পাঁচটি সভাসহ মোট ১১টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জসীম উদ্দিন আহমেদ ৮-১০ ও ১৬-১৮তম বোর্ডসভায় টানা তিন দিন করে মোট আটটি বোর্ডসভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারিকুল ইসলাম সজিব টানা সাতটিসহ মোট ১১টি বোর্ডসভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার পারভেজ বাদল টানা ৫টিসহ মোট ৮টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হাসান ছয়টিসহ মোট ১৪টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম রাসেল টানা চারটিসহ আটটি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. বিল্লাল শাহ ২-৫ ও ১১-১৩ টানা ৪ও৫ দিনসহ ১১টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন ১৪-১৬টি বোর্ডসভায় টানা তিন দিনসহ মোট ছয়টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু ২-৬ ও ১০-১৭তম বোর্ডসভায় টানা পাঁচ ও আট দিনসহ মোট ১৫ দিন অনুপস্থিত ছিলেন। ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মকবুল ইসলাম খান টিপু ১৩-১৫টি সভাসহ মোট ছয়টিতে অনুপস্থিত ছিলেন। ৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাছিম মিয়া ১৫-১৭টির মধ্যে টানা তিনদিনসহ মোট পাঁচটি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন।

সংরক্ষিত আসনে ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রাশিদা পারভীন মণি ৩-৬টির মধ্যে টানা চার দিন ও ১২-১৪তম টানা তিনটি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোসাম্মৎ শিউলী হোসেন পঞ্চম থেকে অষ্টম টানা চারটি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মমিনুল হক সাঈদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাকে নোটিস করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। তাই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে নতুন কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এখনো আসেনি; আসলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, গণমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে নিউজ আসলে সেটাও তদন্ত করা হবে। অভিযোগ পাওয়া গেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"