আ.লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন

নভেম্বরজুড়ে সম্মেলন

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

আওয়ামী লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন দুয়ারে। চারদিকে উৎসব-উৎসব ভাব। সবখানে নেতাকর্মীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন দীর্ঘদিন সম্মেলন বঞ্চিত নেতাকর্মীরা। তবে এত দিন পদ আঁকড়ে রাখার প্রবণতা কিংবা পদ হারালে মূল দলে জায়গা না পাওয়ার শঙ্কায় সংগঠনগুলোর বর্তমান নেতৃত্ব সম্মেলন করতে চাচ্ছিলেন না বলে খবর চাউর হয়েছিল দলেই। কিন্তু খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সম্মেলনমুখী হয়েছেন নেতারা। এখন ক্ষমতাসীন এই দলটির ৭ অঙ্গ ও সহযোগী এবং ৩ ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন হচ্ছে নভেম্বরজুড়ে। এদিকে এসব সম্মেলন ঘিরে সরব রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। বিকাল হতেই অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের ভিড় জমছে। বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা থেকে কর্মীদের নিয়ে আসছেন নেতারা। পাশাপাশি নেতাদের দ্বারে দ্বারেও ঘুরছেন পদপ্রত্যাশীরা। কিছু নেতাদের অপকর্মের গ্লানি দূর করে দলকে আবারো ঢেলে সাজানোর প্রত্যয় তাদের। তারা চান, এবার যেন দুর্দিনের কর্মীদের মূল্যায়ন হয়। অপর সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ কার্যালয়েও নিয়মিত বসছেন নেতারা।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন কখনোই সময়মতো হয় না। সংগঠনগুলোর দুই বা তিন বছর মেয়াদি কমিটিগুলো দ্বিগুণেরও বেশি সময় পার করেছে। কোনোটির সম্মেলন হতে যুগও পার হতে দেখা গেছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে না হলেও দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের সম্মেলনের হার অন্য সংগঠনগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৬ নভেম্বর বুধবার বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর শনিবার বেলা ১১টায় একই স্থানে জাতীয় শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর শনিবার বেলা ১১টায় (ভেন্যু গতকাল রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি) স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ২৩ নভেম্বর শনিবার বেলা ১১টায় যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন হবে। এছাড়া আগামী ২৯ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সম্মেলন হবে।

মহিলা আওয়ামী লীগ : ১৯৬৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ বছর সংগঠনটি তার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে। সংগঠনটির সর্বশেষ ৫ম জাতীয় সম্মেলন হয়েছে ২০১৭ সালের ৪ মার্চ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে গড়ে ১০ বছর পর পর।

বাংলাদেশ কৃষক লীগ : আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল। গণতন্ত্র অনুসারে প্রতি তিন বছর পর পর সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ৬টি। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৯ জুলাই কৃষক লীগের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন হয়। যেটি হয়েছিল ৯ বছর পরে।

কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা বলেন, আগে আমাদের নিয়মিতই সম্মেলন হতো। কিন্তু দল ক্ষমতায় আসার পরই এটা ওলটপালট হয়ে গেছে। সময়মতো করতে পারিনি। তবে আমাদের সাংগঠনিক নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ দিয়েছেন আমরা সম্মেলন করছি। আগামী ৬ নভেম্বর আমাদের সম্মেলন হবে।

যুবলীগ : যুবলীগ ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠার পর পার করেছে ৪৭ বছর। গঠনতন্ত্রে তিন বছর পরপর সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে ছয়বার। সর্বশেষ কংগ্রেস হয়েছে ২০১২ সালের ১৪ জুলাই। বর্তমান কমিটি ৭ বছর পার করেছে।

জানতে চাইলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, সম্মেলনের খবরে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়েছে। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ও বিশ্বাস বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বস্ত, সৎ, মেধাবী ও যোগ্যদেরই নেতৃত্বে বসাবেন।’

যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মইনুল হোসেন খান নিখিল বলেন, এ সম্মেলনের মাধ্যমে নানা কারণে বিপর্যস্ত যুবলীগ নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে। আমরা চাই সৎ, মেধাবী ও যোগ্যরা নেতৃত্বে আসুক।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ : তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা ১৯৯৪ সালের ২৭ জুলাই ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ২০০৩ সালের জুলাই মাসে প্রথম সম্মেলন হয়। এরপর দ্বিতীয় ও সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১২ সালের ১১ জুলাই।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় উপপ্রচার সম্পাদক ও প্রচার উপকমিটির সদস্য ওবায়দুল হক খান বলেন, সম্মেলনের আয়োজন নিয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে। আমরা দফায় দফায় সভা করছি। ২০১ সদস্যের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করা হয়েছে। আমরা আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মেনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিক সাঈদ বলেন, সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। আমরা চাই সম্মেলনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব আসুক। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক কে এম মনোয়ারুল ইসলাম বিপুল বলেন, দীর্ঘদিন সম্মেলন বঞ্চিত থাকা সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। আমার চাই নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব।

যুব মহিলা লীগ : আওয়ামী লীগের নবীনতম সহযোগী সংগঠনের একটি হচ্ছে যুব মহিলা লীগ। ২০০২ সালের ৬ জুলাই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা পায়। ২০০৪ সালের ১৫ মার্চ হয় প্রথম সম্মেলন। আর ২০১৭ সালের ১১ মার্চ দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়।

তাঁতী লীগ : প্রথমে তাঁতী সমিতি নামে পরিচালিত হলেও ২০০৩ সালে বাংলাদেশ তাঁতী লীগ নামে যাত্রা শুরু হয়। পরে আওয়ামী লীগ সহযোগী সংগঠনের মর্যাদা পায়। ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আর সম্মেলন হয় ২০১৭ সালের ১৯ মে।

আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ : ২০০০ সালের ২০ জুলাই প্রতিষ্ঠার পর ১৯ বছরেও সম্মেলন করতে পারেনি আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ। সংগঠনটিকে সহযোগী সংগঠনের মর্যাদা দেওয়া হয়। এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী আইনজীবীদের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ নামে আরো একটি সংগঠনের জন্ম হয়। ২০১৭ সালে সম্মেলন করার কথা থাকলেও বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। সম্মেলন করার জন্য আহ্বায়ক কমিটি গত ৫ অক্টোবর বৈঠক করেছে। তবে সম্মেলনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) : ১৯৯৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) গঠিত হয়। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর চতুর্থ সম্মেলন হয়। গঠনতন্ত্র অনুসারে প্রতি ২ বছর পর পর সংগঠনটির সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা। এ হিসাবে ১৬ বছরে ৮টি সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। তবে হয়েছে এর অর্ধেক।

শ্রমিক লীগ : ১৯৬৯ সালের প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিক লীগ। তিন বছর পর পর শ্রমিক লীগের সম্মেলনের কথা থাকলেও তা হয় না। সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১২ সালের ১৭ জুলাই। শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সম্মেলনের চিঠি পেয়েছি। আমরা আগে থেকেই সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। এখনো আছি।’

ছাত্রলীগ : ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। প্রতি দুই বছর পর পর ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ৩৫টি সম্মেলনের কথা কিন্তু হয়েছে ২৯টি। আর সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছে ২০১৮ সালে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাহাদুর বেপারী বলেন, সম্মেলন নিয়মিত হয় না এটা বলা যাবে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে সময়মতো করা যায় না। একটি সম্মেলনের জন্য অনেক প্রস্তুতির বিষয় থাকে। তবে দেশের যেকেনো রাজনৈতিক সংগঠনের তুলনায় আওয়ামী লীগ বা তার সহেযোগী সংগঠনগুলো সম্মেলন অনুষ্ঠানে গঠনতন্ত্র মেনে চলে।

"