বিদ্যুৎ নিয়ে স্বস্তিতে এখন চট্টগ্রামবাসী

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম

বিদ্যুৎ নিয়ে স্বস্তিতে এখন চট্টগ্রামবাসী। আগের মতো লোডশেডিং নেই। কোনো কারণে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হলে সেবা মিলছে যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে। আগে যেখানে বিদ্যুৎ নিয়ে অভিযোগ দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের কন্ট্রোলের কাজ আরো গণমুখী করা হয়েছে। কোথায় বৈদ্যুতিক বিপর্যয় হলে দ্রুতগতিতে পৌঁছে যাচ্ছে টিম। আগে যেখানে বিদ্যুতের অভিযোগ নিয়ে প্রকৌশলীদের কাছে যেতে পারত না গ্রাহকরা, সেখানে প্রকৌশলীরা এখন অপেক্ষা করে জবাব দিতে। মিটার পদ্ধতি ডিজিটাল করার ফলে যেকোনো দোকান থেকে টাকা ঢুকিয়ে নিজের সংযোগ সচল করতে পারছেন গ্রাহকরা। বর্তমান সরকার বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে প্রায় সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

আগামী ২০৪১ সালকে টার্গেট করে দীর্ঘমেয়াদি এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ নেওয়ার দাবি সেখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের। কারণ এখানে বিদ্যুৎ নেওয়া কঠিন ব্যাপার। এ অবস্থায় সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে এখানে বিদ্যুৎ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। সবচেয়ে বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে মহেশখালীতে। এখানে ১০ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকার বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদাও। ২০৪১ সাল নাগাদ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে কয়েক গুণ। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সারা দেশের মতো চট্টগ্রাম অঞ্চলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, গ্রিড নেটওয়ার্ক ও বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরির বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মহেশখালী মাতারবাড়িতে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে আর্থসামাজিক ও মানব উন্নয়নসহ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরো ১০ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের

সমীক্ষা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ফার্নেস অয়েল ও ডুয়েল ফুয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতাধীনে বাঙ্গালহালিয়ায় ৬০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এ ছাড়া কাপ্তাইয়ে ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট বসানোর কাজও চলমান আছে; কাজ সমাপ্তের পর ওই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলে হেলদি গ্রিড নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য সাতটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার এমভিএ ক্ষমতার ১৫টি গ্রিড উপকেন্দ্র, ৪০০ কেভি, ২৩০ কেভি এবং ১৩২ কেভি লাইন নির্মাণের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলকে হলদি গ্রিড নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত করা হচ্ছে। এতে ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভোল্টেজ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উন্নয়র বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ১১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম জোনের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চলমান আছে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৪টি ৩৩/১১ কেভি নতুন উপকেন্দ্র ও আটটি উপকেন্দ্র আপগ্রেডেশন করা হবে। ফলে উপকেন্দ্রের ক্ষমতা প্রায় ৭৫০ এমভিএ বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া ১৬৩ কিলোমিটার ৩৩ কেভি, ৩০০ কিলোমিটার ১১ কেভি, ৩০০ কিলোমিটার ১১/০.৪ কেভি নতুন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। ২৬৭ কিলোমিটার ৩৩ কেভি, ১০০ কিলোমিটার ১১ কেভি, ৩০০ কিলোমিটার ১১/০.৪ কেভি লাইন নবায়ন করা হচ্ছে। দেড় হাজার ১১/০.৪ কেভি ২৫০ কেভিএ বিতরণ ট্রান্সফরমার স্থাপনসহ সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সন্দ্বীপ উপজেলাকে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার কাজ চলমান আছে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরো পাঁচ লাখ নতুন গ্রাহক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ দিকে তিন পার্বত্য জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ৫৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় তিন পার্বত্য জেলায় ১২টি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র নির্মাণ, চারটি উপকেন্দ্র আপগ্রেডেশন, ২৫২ কিলোমিটার ৩৩ কেভি, ৪৭০ কিলোমিটার ১১ কেভি, ২৩০ কিলোমিটার ১১/০.৪, ৩৬০ কিলোমিটার ০.৪ কেভি লাইন এবং ১৭৭টি থ্রি ফেইজ ট্রান্সফরমার, ১৫০টি সিঙ্গেল ফেইজ ট্রান্সফরমার স্থাপনের কাজ চলমান আছে।

অন্যদিকে ২০৩০ সাল উপযোগী বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ডিপিপি প্রণয়নের কাজ প্রক্রিয়াধীন। এই প্রকল্পের অধীনে ৩৪টি ৩৩/১১ কেভি নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ, সাতটি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র আপগ্রেডেশন, ১২৮.৫ কিলোমিটার ৩৩ কেভি, ৬০০ কিলোমিটার ১১ কেভি, ৮০০ কিলোমিটার ১১/০.৪ কেভি, ১ হাজার কিলোমিটার ০.৪ কেভি নতুন লাইন নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ৫৮ কিলোমিটার ৩৩ কেভি, ৩০০ কিলোমিটার ১১ কেভি, ৪০০ কিলোমিটার ১/০.৪ কেভিএবং ৮০০ কিলোমিটার ০.৪ কেভি লাইন নবায়ন করা হবে। ৪৯৮.৩ কিলোমিটার ৩৩ কেভি এক্সএলপিই, ৩০ কিলোমিটার ৩৩ কেভি এক্সএলপিই এবং ৩১ কিলোমিটার ১১ কেভি এক্সএলপিই আন্ডারগ্রাউন্ড কপার ক্যাবল স্থাপন এবং ৩ হাজার ৮১২টি ১১/০.৪ কেভি, ২৫০ কেভিএ এবং এক হাজারটি ১১/০.২৩ কেভি, ৫০ কেভিএ ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হবে। ফলে বিতরণ সিস্টেমের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রাহককে মানসম্মত, সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নতুন গ্রাহক সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, বোয়ালখালী ও সীতাকু- উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ শেষ হয়েছে। পটিয়া ও হাটহাজারী উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ শেষ হওয়ার পথে। এ ছাড়া সাতকানিয়া ও চন্দনাইশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ শেষ হয়েছে। কক্সবাজার সদর, রামু, চকরিয়া, লামা ও নাইক্ষংছড়ি উপজেলার অবিদ্যুতায়িত এলাকায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজও শেষ হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ এর ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হওয়ার পর রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে।

 

"