মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাতে দেখে ছাত্রলীগ নেতার মন্তব্য

‘ফেলে রাখ ও নাটক করতাছে’

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

ঢাবি প্রতিনিধি

আবরারের মতোই বুয়েটের শেরেবাংলা হলে থাকেন আরাফাত ও মহিউদ্দিন। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়ার পর মহিউদ্দিন তাকে দেখেন কাতরানো অবস্থায়। আর আরাফাত যখন ফাহাদকে দেখেন, তখন তার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীর নির্যাতনে নিহত আবরারের শেষ সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী এই দুজন সেসব ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এর মধ্যে আরাফাত আফসোস করে বললেন, তিন থেকে চার মিনিট আগে তিনি যদি সেখানে উপস্থিত হতে পারতেন, তাহলেও হয়তো আবরারকে বাঁচানো যেত। মহিউদ্দিন বললেন, ফাহাদকে কাতরানো অবস্থায় দেখার সময় এক ছাত্রলীগ নেতা বলছিলেন, ‘ফেলে রাখ, ও নাটক করতাছে।’ এ রকম পরিস্থিতিতে তাকে বাঁচাতে না পারায় মহিউদ্দিনের এখন আফসোস হচ্ছে। গতকাল বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে এই দুই ছাত্র বিক্ষোভে অংশ নিয়ে ওই ঘটনার বর্ণনা দেন। তখন ওই দুই ছাত্রসহ অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের এমন বর্ণনায় ধীরে ধীরে সামনে আসছে ফাহাদ হত্যার নির্মমতার চিত্র। ভারি হয়ে উঠছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসের বাতাস। বুধবার সকালে ১০ দফা নতুন কর্মসূচি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে ভিসির অপসারণের দাবি জানিয়েছে বুয়েট অ্যালামনাই। এছাড়া সন্ধ্যা ৭টায় দেশোর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রদীপ প্রজ্বালন করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর সাড়ে ১২টার কিছুক্ষণ পর পলাশী থেকে কিছু দূরে বুয়েট পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ করার কথা থাকলেও আবরারের রুমমেট আর প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বর্ণনায় উঠে আসছিল সেই রাতে নির্মমতার চিত্র। উপস্থিত সবার চোখ ছিল অশ্রুশিক্ত। গত রোববার রাতে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সোমবার ভোরে শেরেবাংলা হলের প্রথম ও দ্বিতীয়তলার সিঁড়ির মধ্যবর্তী জায়গায় আবরারের নিথর দেহ পাওয়া যায়। তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল।

ফাহাদ বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (ইইই) বিভাগের লেভেল-২ এর টার্ম ১ এর ছাত্র ছিলেন। তিনি শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়া শহরে। কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে তিনি স্কুলজীবন শেষ করে নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।

১০ দফা আন্দোলন কর্মসূচি দেন আন্দোলনকারীরা। পরে একটি মিছিল পুরো ক্যাম্পাস আর আবরারের হল শেরেবাংলা হল চত্বর প্রদক্ষিণ করে। এদিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে সমাবেশ করেছে বুয়েটের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। তারাও ৭ দফা দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ফাহাদ হত্যাকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছে তাতে একত্মতা জানিয়েছেন সাবেক শিক্ষার্থীরাও। তাদের একটায় দাবি এ ধরনের ঘটনা যেন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুনরাবৃত্তি না হয়।

আরাফাত বলেন, পড়া শেষে রাতে নিচে খাবার আনতে বেরিয়েছিলেন তিনি। তখনই দেখেন তোশকের মধ্যে একজন পড়ে আছেন। তখনো তার চিন্তায় আসেনি এ রকম হতে পারে। তার ধারণা হয়েছিল, হয়তো কেউ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। এক সেকেন্ডের জন্যও মাথায় আসেনি এভাবে কাউকে মারা হতে পারে। তিনি বলছিলেন, যখন ফাহাদের হাত ধরেন, তখন হাত পুরো ঠান্ডা, পা ঠান্ডা। শার্ট-প্যান্ট ভেজা। তোশক ভেজা। মুখ থেকে ফেনা বের হয়েছে। তিনি বলছিলেন, ‘তখন ওকে বাঁচানোর জন্য বুকে চাপ দিই। হাতে চাপ দিই। আশপাশের সবাইকে বলি, কেউ একজন ডাক্তারকে ম্যানেজ কর। এরপর ডাক্তার আসলেন। ডাক্তার দেখে বলেন, ১৫ মিনিট আগেই সে মারা গেছে।

আফসোস করে কাঁদতে কাঁদতে আরাফাত বলছিলেন, তিন থেকে চারটা মিনিট আগে যদি খাবার আনতে যাইতাম, তাহলে পোলাডারে বাঁচাইয়া রাখতে পারতাম। এই তিন মিনিটের আফসোসে তিন দিনে তিন ঘণ্টাও ঘুমাইতে পারি নাই।’

আরাফাত এ বক্তব্য দেওয়ার পরপরই মহিউদ্দিন বলছিলেন, আরাফাতের তো তিন মিনিটের আফসোস আছে, আর আমার আছে অনুতাপ।

আরাফাত ফেলে রাখার দৃশ্য দেখার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘তখন আড়াইটার মতো বাজে। তিনি খেতে বের হয়েছেন। তখন দেখেন আবরার কাতরাচ্ছেন। তখনো ছাত্রলীগ নেতা জিয়ন বলছিলেন, ‘ও (ফাহাদ) নাটক করতাছে।’ নিষ্ঠুরতার এই বর্ণনা দিতে দিতে মহিউদ্দিন আবারও কেঁদে ফেলে বলেন, আমি ওরে বাঁচাইতে পারিনি। মাফ করে দিস, ভাই। আমারে সবাই মাফ কইরা দিস। আমি জীবিত দেইখাও ওরে বাঁচাইতে পারি নাই।’

 

"