বিক্ষোভে অচল বুয়েট

* ভিসির পদত্যাগের দাবিতে একাট্টা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা * শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত * শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবি বেড়ে ১০ * শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টের পদত্যাগ

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতসহ ১০ দফা দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো গতকাল বুধবারও উত্তাল ছিল বুয়েট ক্যাম্পাস। বন্ধ ছিল ক্লাশ-পরীক্ষাসহ বুয়েটের সব কার্যক্রম। আর এই হত্যাকা-ের রেশ বুয়েট ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দেশে জ্বলছে প্রতিবাদ ও ক্ষোভের আগুন। অব্যাহত রয়েছে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি। আবরার ফাহাদ স্মরণে এবং তার হত্যার প্রতিবাদে মোমবাতির আলো জ্বলল বিভিন্ন ক্যাম্পাসে। মোমবাতির আলোর সঙ্গে ছিল ফাহাদ হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে গগনবিদারী সেøাগান।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় বুয়েটের শহীদ মিনার চত্বরে পূর্বঘোষিত মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি শুরু হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনার চত্বর থেকে মৌন মোমবাতি মিছিল নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে একই জায়গায় ফিরে আসেন। এই মিছিলের ঢেউ আছড়ে পড়ে সারা দেশে। বিভিন্ন শহরে-গ্রামে আয়োজন করা হয়েছে সমাবেশ ও মানববন্ধন। দাবি একটাই, ‘আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই’। এসব কর্মসূচিতে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

গতকাল সকাল ১০টায় বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রথমে মৌন মিছিল এবং পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আবরার হত্যার প্রতিবাদে গত সোমবার বিকেল থেকেই উত্তাল বুয়েট ক্যাম্পাস। আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীরা মামলার অভিযোগপত্র না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছেন। এ ছাড়া বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধেরও দাবি জানানো হয় সমাবেশ থেকে। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্ম হতে গতকাল বুয়েটে আসেন জাতীয় অধ্যাপক প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। বুয়েট অ্যালামনাইয়ের পক্ষে তিনিও ভিসির পদত্যাগসহ সাত দফা দাবি তুলে ধরেন।

এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টের পদ ছাড়লেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল খান। গতকাল বুধবার বুয়েট শহীদ মিনার এলাকায় আন্দোলনকারীদের সামনে এসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ শিক্ষার্থীদের এ কথা জানান।

অন্যদিকে গত মঙ্গলবার রাত ১০টায় দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন স্থগিত করেন শিক্ষার্থীরা। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী পরদিন অর্থাৎ গতকাল সকাল থেকে বুয়েট ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন তারা। প্রথমে তারা জড়ো হন বুয়েট শহীদ মিনারে। সেখান থেকে মৌন মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাস ঘুরে আবার শহীদ মিনারে মিলিত হয়। সেখানে বেলা সোয়া ১১টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আন্দোলনকারীরা। তারা আট দফা দাবির সঙ্গে আরো দুটি দাবিসহ নতুন করে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেন। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে রাজনৈতিক কার্যক্রমসহ সব ছাত্র সংগঠন স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধকরণের দাবি জানানো হয়। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য অস্বস্তিতে থাকেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাই এ কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হোক। দাবি মানা না হলে বড় আন্দোলনের হুশিয়ারি দেন তারা।

ভিসির অপসারণসহ আট দফা দাবি জানিয়ে লিখিত বক্তব্য দিয়েছে বুয়েট শিক্ষকরা। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ৩০০ শিক্ষকের সমন্বয়ে এক বৈঠকের পর শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এ সময় বর্তমান ভিসির অদক্ষতা ও নানা অনিয়মে নির্লিপ্ততার পরিপ্রেক্ষিতে ভিসির পদত্যাগ চান শিক্ষকরা।

এর আগে দুপুরে আবরার ফাহাদকে হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাসহ ১০ দফা দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে বকশীবাজার থেকে পলাশী মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করেন তারা। শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোÑ আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে চার্জশিটের কপিসহ অফিশিয়াল নোটিস দিতে হবে। বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগ এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি দাবির সঙ্গে তারা আলটিমেটাম দিয়েছেন। আর এই দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো একাডেমিক কাজ চলবে না বলেও জানিয়ে দেন তারা।

এদিকে বুয়েট শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক সমিতির জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। গতকাল বুয়েট ক্যাম্পাসে আবরার হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে এ তথ্য জানিয়েছেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. এ কে এম মাসুদ। তিনি আন্দোলনকারীদের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের রাজনীতিও শিগগিরই নিষিদ্ধ করা হবে। সকাল ১০টায় সমিতির জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে ৩০০ শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ বলেছেন, একজন অদক্ষ ভিসির কারণে আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট হতে দেব না। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। আমরা অপরাধী। বুয়েট শিক্ষক সমাজ আবরারের বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। তবে হত্যাকা-ে জড়িতদের বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কার করতে যাচ্ছি আমরা। এ ছাড়া বুয়েটের স্বার্থে কোনো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরোক্ষ রাজনীতিতে জড়িত হবে না বলেও বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় ভিসির পদত্যাগসহ আট দফা তুলে ধরেন তিনি। আট দফা দাবির অন্যতম হচ্ছে, হত্যাকারীদের বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আবরার হত্যার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বুয়েট ভিসির পদত্যাগ করতে হবে। স্বেচ্ছায় তিনি পদত্যাগ না করলে অপসারণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়।

এদিকে আবরার ফাহাদের হত্যায় জড়িত সবাইকে বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল দুপুরে বুয়েট ক্যাম্পাসে আবরার হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধনে এ আহ্বান জানান অ্যালামনাইয়ের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তুলে ধরেন সাত দফা দাবি। তিনি বলেন, হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত সবাইকে বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে। ক্যাম্পাসে সব রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করার দাবিও জানানো হয়। উপাচার্যের অপসারণসহ প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন এনে এতিহ্যবাহী বুয়েটের সুনাম ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান জামিলুর রেজা চৌধুরী। র?্যাগিং বা অন্য অজুহাতে ছাত্র নির্যাতন নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আবরারসহ আগের হত্যাকা-গুলোর বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জানায় বুয়েট অ্যালামনাই।

বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ

গতকাল দুপুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। পরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ডেইরি গেটের সামনে অবস্থান নিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন তারা। এতে ফাহাদ হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার দাবি জানানো হয়। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। খুলনায় বিএল কলেজের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া, বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে লক্ষ্মীপুর, নাটোর, টাঙ্গাইল, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, রাজবাড়ী, নেত্রকোনা, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলায়।

প্রসঙ্গত, ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে গত ৫ অক্টোবর বিকেলে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন আবরার ফাহাদ। এর জেরে পরদিন রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা। হত্যাকা-ের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলেট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

এ ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় ১৪ জন জড়িত বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায়। এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে তার বাবা চকবাজার থানায় সোমবার রাতে একটি হত্যা মামলা করেন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পাশাপাশি গঠন করেছে একটি তদন্ত কমিটিও। এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় বুয়েট শাখার সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ জনকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

শেরে বাংলার প্রভোস্টের পদত্যাগ

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে উত্তাল আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টের পদ ছাড়লেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল খান। গতকাল বুধবার বুয়েট শহীদ মিনার এলাকায় আন্দোলনকারীদের সামনে এসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ শিক্ষার্থীদের এ কথা জানান। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার জন্য শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি।

গত রোববার সন্ধ্যায় বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরারকে ডেকে নিয়ে যায় হলের কিছু ছাত্রলীগ নেতা। শিবির সন্দেহে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের এক পর্যায়ে গভীর রাতে হলেই তার মৃত্যু হয়। সোমবার ভোরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সোমবার দিনভর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন করলেও উপাচার্য কিংবা হলের প্রভোস্ট ঘটনাস্থলে যাননি, যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

যে ১০ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে তার মধ্যে ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায়’ শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করার দাবি ছিল একটি।

 

"