সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

পিটিয়ে হত্যাকারীদের কঠিনতম শাস্তি হবে

* ফুটেজ সংগ্রহে বাধা দিল কারা? * শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলে তল্লাশি করা হবে * বুয়েট চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে, আমি পক্ষে নই * যেখানে অনিয়ম, সেখানেই সাঁড়াশি অভিযান * দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে, এটা হতে পারে না * কেউ পানি পান করতে চাইলে যদি না দিই, কেমন দেখায়?

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে যারা ‘পিটিয়ে পিটিয়ে অমানবিকভাবে’ হত্যা করেছে, তাদের কঠিনতম শাস্তি হবে। গতকাল বুধবার গণভবনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, সে কোন দল, কী করে না করে, আমি কিন্তু সেটা দেখি না। আমার কাছে অপরাধী অপরাধীই। আমরা অপরাধী হিসেবেই দেখি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ নৃশংসতা কেন? এই জঘন্য কাজ কেন? এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যত ধরনের উচ্চ শাস্তি আছে, সেটা দেওয়া হবে। কোনো সন্দেহ নেই। দল বুঝি না। অপরাধের বিচার হবেই।

আওয়ামী লীগের কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে, তা কখনোই মেনে নেবেন না মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ঘটনা জানার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকে বলেছি, জড়িতদের যেন বহিষ্কার করা হয়। অপরাধী অপরাধীই। কীসের ছাত্রলীগ, অন্যায়কারীর বিচার হবে। কারো দাবির অপেক্ষায় থাকি না। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুয়েটে যে ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনা খুব সকালবেলা জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম আলামত সংগ্রহ করার জন্য। এটাও বলেছিলাম, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে। তারা সেখানে পৌঁছে যায়। আলামত সংগ্রহ করে এবং সিসিটিভি ফুটেজগুলো দীর্ঘসময় ধরে সংগ্রহ করে। যখন পুলিশ সিসি ক্যামেরা থেকে ফুটেজ হার্ডডিস্কে নিয়ে আসছে, তখন তাদের ঘেরাও করা হলো। তাদের ফুটেজ নিয়ে আসতে দেওয়া হবে না। আইজিপি যোগাযোগ করে বলল, ‘আমাদের লোকদের আটকে রেখেছে। আলামত নিয়ে আসতে দিচ্ছে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফুটেজগুলো আনতে দেবে না কেন? তারা বলছে, ফুটেজগুলো পুলিশ নষ্ট করবে। পুলিশ গেছে আলামত সংগ্রহ করতে। ডেডবডির যাতে পোস্টমর্টেম হয়, সেই ব্যবস্থা করা হলো। সবগুলোকে অ্যারেস্ট করা হলো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কে ছাত্রলীগ, কে ছাত্রদল, কে কী করে, আমি সেটা বিবেচনা করিনি। আমি বিবেচনা করেছি অন্যায়ভাবে একজন ২১ বছরের ছেলেকে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকেছি। সবগুলোকে বহিষ্কার করতে বলেছি। পুলিশকে বলেছি অ্যারেস্ট করতে। কারা পুলিশকে ফুটেজ নিতে বাধা দিয়েছে, তা খুঁজে দেখতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফুটেজ হাতে পাওয়ার পর বেছে বেছে বের করতে পুলিশের জন্য সুবিধা হয়েছে। এটা একটু খোঁজ করেন, কেন বাধা দেওয়া হলো। তিনটা ঘণ্টা সময় কেন নষ্ট করল? আমি জানি না এর উত্তর আছে কি না। আন্দোলনইবা কীসের জন্য? বিচার হবেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলগুলোতে উচ্ছৃঙ্খলতা, অনিয়ম বের করতে তল্লাশি চালানো হবেও বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে বলব, যখন এ ঘটনা একটা জায়গায় ঘটেছে, সেখানে এক রুম নিয়ে বসে জমিদারি চালানো, সেটা তো হতে পারে না। তাই প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হল সার্চ করা দরকার। কোথায় কী আছে না আছে, খুঁজে বের করা এবং কারা মস্তানি করে বেড়ায়, সেটা দেখা দরকার।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সামান্য টাকায় সিট ভাড়ায় একেকজন রুমে থাকবে আর তারপর সেখানে বসে এ ধরনের মস্তানি করবে আর সব খরচ বহন করতে হবে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা দিয়ে। সেটা কখনো গ্রহণযোগ্য না। সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিটি হলÑ সব জায়গায় সার্চ করা হবে এবং দেখা হবে।

ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সরকারপ্রধান বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাইলে করুক, আমরা কেন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করব। প্রতিটি সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা আছে ছাত্রদের। বুয়েট যদি মনে করে সেখানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করবে; তারা করতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের নেতৃত্ব উঠে এসেছে ছাত্র রাজনীতি থেকে। আমি ছাত্র রাজনীতি করেই এখানে এসেছি। এ জন্য আমরা দেশের জন্য কাজ করতে পারি।

ক্যাসিনো প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা এখন ক্যাসিনো খেলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে বা এ ধরনের জুয়া খেলায় অভ্যস্ত, কেউ হয়তো দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, কেউ হয়তো নানা ফন্দি আঁটছে, তাদের বলছি, একটা দ্বীপ খুঁজে বের করেন, সেই দ্বীপে আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। ভাসানচর বিশাল দ্বীপ। একপাশে রোহিঙ্গা আরেক পাশে আপনাদের ব্যবস্থা করে দেব। সবাই ওখানে চলে যান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বাস্তবতা বলছি, অভ্যাস যখন বদভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, এ বদভ্যাস তো যাবে না। বারবার খোঁচাখুঁচি করতে হবে। তাই বারবার খোঁচাখুঁচি না করে একটা জায়গাই দিয়ে দেব। ভাসানচরে এক সাইডে যদি ব্যবস্থা করে দিই, ওটা খুব বড় চর, অসুবিধা নেই। ১০ লাখ লোককে বসতি দেওয়া যাবে। কারা কারা করতে চান তারা যান, নীতিনালা তৈরি করেন, লাইসেন্স নিতে হবে, ট্যাক্স দিতে হবে, তারপর যে ইচ্ছা খেলুক আমার কোনো আপত্তি নেই। এতে সরকারের আয় বাড়বে, দেশের উন্নয়নে কাজে লাগবে।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, যেখানে অনিয়ম আছে, সেখানেই সাঁড়াশি অভিযান চলবে। কতদূর যাবে আর কতদূর যাবে না, সেটা কোনো কথা নয়। এটা বহু দিন ধরে ছিল, কেউ কখনো বলেনি, খেয়ালও করেনি। আমি যদি বলি আপনারা সাংবাদিকরা কোনো দিন বলেননি যে এ রকম একটা অনিয়ম হচ্ছে। এত খবর আপনারা রাখেন, আপনাদের ক্যামেরা এত জায়গায় ঘুরে। তো কই এই জায়গায় কেন পৌঁছায় নাই? সে প্রশ্নের জবাব কি দিতে পারবেন? পারবেন না। বাস্তবতা হলো, আমি যখনই এ খবর পেয়েছি তখনই ব্যবস্থা নিয়েছি এবং এ রকম ব্যবস্থা নিতেই থাকব।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যে চুক্তিটা হয়েছে সেটা তাদের খাবার পানির জন্য। তারা যখন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে, সেটার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ে। তাই নদী থেকে সামান্য পানি দিচ্ছি। কেউ যদি পানি পান করতে চায় আর আমরা না দিই, সেটা কেমন দেখা যায়?

ভারতের সঙ্গে গ্যাস নিয়ে চুক্তির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে দেবেÑ এটা কখনো হতে পারে না। আমরা বিদেশ থেকে এলপিজি গ্যাস এনে প্রক্রিয়াজাত করে ভারতে রফতানি করব। এটা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। অন্য পণ্য যেমন আমরা রফতানি করি ঠিক তেমন। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই।

এর আগে বিশ্ব শিশু দিবস এবং শিশু অধিকার সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে শিশুদের জন্য মাদক, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের থাবা থেকে মুক্ত ও উন্নত জীবন নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করবে, যাতে আজকের শিশুরা সামনের দিনগুলোতে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ লাভ করে। আমরা এই লক্ষ্য অর্জনেই কাজ করে যাচ্ছি।

শিশুদের উন্নত জীবনের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী এবং মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিশু অধিকার রক্ষায় বঙ্গবন্ধু শিশু আইন-১৯৭৪ অনুমোদন করেন।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আজকের শিশু আনবে আলো, বিশ্বটাকে রাখবে ভালো।’

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শিশু একাডেমির চেয়ারম্যন লাকী ইনাম এবং ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ ভেরা মেনডোনকা, মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার, শিশুদের পক্ষে দুই শিশু মাহজাবিন এবং আবদুল্লাহ আল হাসান। রওনক জাহান এবং আদিল কিবরিয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে শিশুদের লেখা চিঠির একটি সংকলন এবং একটি শিশুর আঁকা তার পোট্রেট শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রধানমন্ত্রী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন এবং শিশুদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী নতুনভাবে সাজানো কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং শিশু একাডেমি চত্বরে বঙ্গবন্ধু কর্নার পরিদর্শন করেন। সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার বড় মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা বই এবং তাদের ওপর লেখা বই রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নতুন করে সাজানো শেখ রাসেল গ্যালারি এবং শেখ রাসেল চিলড্রেন মিউজিয়ামে শেখ রাসেল আর্ট গ্যালারি পরিদর্শন করেন।

 

"