আবরার হত্যা

বুয়েট ছাত্রলীগের ১০ নেতা রিমান্ডে

গ্রেফতার আরো তিনজন, মামলা ডিবিতে

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

আদালত প্রতিবেদক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ছাত্রলীগের ১০ নেতার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার তাদের ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় চকবাজার থানায় করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এছাড়া ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৩ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী মামলার এজাহার গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৩ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।

এদিকে ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় চকবাজার থানায় করা মামলার তদন্তের দায়িত্ব ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গতকাল গোয়েন্দা পুলিশের কাছে মামলার তদন্তভার হস্তান্তর করা হয়েছে।

যাদের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে তারা হলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি মুস্তাকিম ফুয়াদ, সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু, উপদফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, উপসমাজকল্যাণ সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপআইন সম্পাদক অমিত সাহা, ক্রীড়া সম্পাদক সেফায়েতুল ইসলাম জিওন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, গ্রন্থনা ও গবেষণা সম্পাদক ইশতিয়াক মুন্না এবং খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির।

এদিকে ফাহাদ হত্যাকান্ডে জড়িত অভিযোগে বুয়েটের আরো তিন ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরা হলেন মনিরুজ্জামান মনির, মো. আকাশ হোসেন ও শামসুল আরেফিন রাফাত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, এই তিনজন ফাহাদের বাবার করা মামলার এৎাহার নামীয় আসামি। মঙ্গলবার বিকালে ডেমরা থেকে মনিরকে এবং জিগাতলা থেকে রাফাতকে গ্রেফতার করা হয়। আকাশকে গ্রেফতার করা হয় সন্ধ্যায় গাজীপুর বাইপাস সড়ক থেকে।

মনির বুয়েটের ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ষোড়শ ব্যাচের তৃতীয় বর্ষে, আকাশ একই ব্যাচের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষে এবং রাফাত মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সপ্তদশ ব্যাচের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ নিয়ে এজাহারভুক্ত ১৯ আসামির মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ; এর মধ্যে ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে পেয়েছে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আরাফাত লেলিন বলেন, বাকি আসামিদের গ্রেফতার করতে আমাদের অভিযান চলছে।

গত রোববার রাত ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সহপাঠীদের বরাতে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, শিবির সন্দেহে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হত্যা করার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার হাসান আরাফাত। তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই হত্যাকান্ডে অংশ নেন। তারা সবাই হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে প্রাথমিকভাবে তারা জানিয়েছে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না। মারধর করতে গিয়ে ফাহাদ মারা গেছেন। তারপরও ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় করা মামলা থেকে বুয়েট ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক ও পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র অমিত সাহাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়নি। তদন্তসাপেক্ষে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ডিবির (ঢাকা দক্ষিণ) এডিসি রাজীব আল মাসুদ।

ঘটনায় জড়িত যারা : সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ফাহাদকে প্রথম দফা পেটানোর ঘটনায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক ও পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা, উপদফতর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুজতাবা রাফিদ, সমাজসেবাবিষয়ক উপসম্পাদক ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ইফতি মোশারফ ওরফে সকালসহ তৃতীয় বর্ষের আরো কয়েকজন। দ্বিতীয় দফায় পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনীক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়নসহ কয়েকজন। তারা সবাই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রাসেলের অনুসারী।

ঘটনার সময় ২০১১ নম্বর কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আশিকুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, ‘রাত ৮টার দিকে আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডাকা হয়। আমি মাঝেমধ্যে ওই কক্ষে বন্ধুর কাছে যাই। ওই দিন রাতে গিয়ে দেখতে পাই, সেখানে আবরারের ফেসবুক আইডি ও মেসেঞ্জার চেক করা হচ্ছে। রাত পৌনে ৯টার দিকে আমি কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসি।

১১ নেতাকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার : ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১১ নেতাকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে ছিলেন। গত সোমবার রাতে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বুয়েটে সাম্প্রতিক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তদন্ত কমিটির পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

 

"