নিজ গ্রামে দাফন

ক্ষোভ অশ্রু ভালোবাসায় আবরারকে চির বিদায়

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

আবরারের বাবা-মা দুজনেই শহরে থাকেন। আর আবরার ও ফায়াজ দুই ভাই লেখাপড়ার সুবাদে থাকতেন ঢাকায়। প্রতি শুক্রবার গ্রামের বাড়িতে আবরারের দাদা-দাদিকে দেখতে আসতেন তার বাবা-মা। আর ছুটিতে কুষ্টিয়া এলেই দাদা-দাদিকে দেখতে গ্রামের বাড়ি যেতেন দুই ভাই। গ্রামের সবাই দুই ভাইকে চিনতেন, স্নেহ করতেন। তবে আর কখনো রায়ডাঙ্গায় আসবেন না আবরার। এলাকাবাসী তাদের প্রিয় আবরারকে ভালোবাসা, অশ্রু চোখে, বেদনা ভরা হৃদয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছেন। আবরার শেষ নিদ্রায় শায়িত হয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের যে রায়ডাঙ্গা গ্রামে বেড়ে উঠেছিলেন, মেধাবী হিসেবে স্বীকৃতি কুড়িয়েছিলেন গোটা কুষ্টিয়ায়, সেই গ্রামেই দাফন হলো তার।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে তৃতীয় জানাজা শেষে সাড়ে ১০টার দিকে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে আবরারকে। জানাজায় তার স্বজন ও গ্রামবাসীসহ এলাকার সব স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। এ সময় তারা দ্রুততম সময়ে আবরারের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সেøাগান দেন।

এদিকে, গতকাল সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে আবরারের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি রায়ডাঙ্গায় পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। ছেলের অকাল মৃত্যুতে আহাজারি করতে করতে আবরারের মা বলেন, আমার বেটা লাখে একটাও হয় না। সবার ঘরে বেটা থাকতে পারে, আমার বেটার মতো বেটা ছিল না। আমার বেটা কোনো দিনও জোরে কারো সঙ্গে কথা বলে নাই। কোনো রাজনীতির মিছিলে যায় নাই। যেখানে রাজনীতির আলাপ করে সেখানেও যায় নাই। আমার বেটা শুধু লেখাপড়া নিয়াই থাকত।

আর লাশের সামনে ডুকরে কাঁদতে থাকেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। বলেন, ওরা আমার ছেলেটাকে এভাবে মারল কেন? কী দোষ করেছিল ও? কী যন্ত্রণা নিয়েই না মারা গেছে আমার বুকের ধন। আপনারা তো সবই শুনেছেন এবং জেনেছেন। তারপরও আমি আমার সন্তানের জন্য আপনাদের কাছে দোয়া চাচ্ছি। একই সঙ্গে নিষ্ঠুর এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।

এর আগে গতকাল ভোরে শহরের পিটিআই রোডের বাড়িতে প্রিয় ছেলের লাশ নিয়ে ফেরেন বাবা বরকত উল্লাহ। ফজরের নামাজ শেষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বাড়ির সামনের সড়কে দ্বিতীয় জানাজা হয়। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাসহ স্থানীয় রাজনীতিবিদ, এলাকাবাসী অংশ নেন।

জানাজার আগে আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, সিসি ফুটেজে দেখা গেছে কারা হত্যায় জড়িত। হত্যার পর আমার ছেলের লাশ ফেলার আগে তারা দুই থেকে তিনবার বাইরে আনে আবার ভেতরে নিয়ে যায়। মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে খুনিরা। এখন দ্রুত সাজা কার্যকর চাই। সাংবাদিক ও ছাত্ররা অনেক ভূমিকা রেখেছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ।

লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়িতে আসার আগেই এলাকার হাজার হাজার নারী পুরুষ, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ভিড় করেন বাড়িতে। একনজর দেখতে আসেন তারা। আবরারের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার দাদা-দাদি। প্রতিবেশীরাও অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা প্রিয় আবরারের এ মৃত্যুতে ব্যথিত।

সাড়ে ৯টার দিকে আবরারের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স বাড়ি থেকে রওনা দেয় গোরস্তানের দিকে। বিদায় বেলায় পুরো বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। ১০টায় রায়ডাঙ্গায় গোরস্তানে দাফনের জন্য আবরারের লাশ রাখা হয়। সেখানে কথা বলেন আবরারের ফুফা ও তার বাবা। পুরো ঈদগাহ ময়দান লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। অনেকে সড়কে দাঁড়িয়ে জানাজা আদায় করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রিপন উদ্দিন বলেন, আবরার আমাদের গ্রামের, জেলার ও দেশের সম্পদ। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তারা হত্যাকা-কে ধামাচাপা দিতে চাইছিল। সারা দেশের মানুষ দেখেছে কীভাবে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর আর কোনো আবরার যেন এমন হত্যার শিকার না হয়।

প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম বলেন, খুনিরা কোনো দিন ছাত্র হতে পারে না। আবরার ছিল মেধাবী ছাত্র। খুনিরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমরা একজন মেধাবী ছেলে ও স্বজনকে হারালাম। এ হত্যার কঠোর সাজা চাই। দাদা আবদুল গফুর বিশ্বাস বলেন, আমার নাতি কী অপরাধ করেছিল, যে তাকে হত্যা করা হলো। আমি এ হত্যার কঠিন বিচার চাই। এমন মৃত্যু কারো কাম্য নয়।

তিনি বলেন, আমার নাতিকে যারা শিবির বানাতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে বলব, ৭০ সাল থেকে আওয়ামী লীগ করে আসছি। আমরা কোনো হাইব্রিড আওয়ামী লীগ না। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি, তার পরিবারকে ভালোবাসি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর এ আসনের সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছি। তাই কোনো অপবাদ দেবেন না। খুনিদের শাস্তির ব্যবস্থা করুন।

 

"