৮ দফা দাবি : অনির্দিষ্টকালের জন্য সব কার্যক্রম বন্ধ

বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েট

সারা দেশে প্রতিবাদ-সমাবেশ

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল সারা দেশ। এমন মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান সবাই। এই নৃশংস হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে, প্রতিবাদে উত্তাল ক্যাম্পাসে ৩৬ ঘণ্টা পর গতকাল মঙ্গলবার বুয়েটে আসেন উপাচার্য ড. সাইফুল ইসলাম। তিনি আসার পরই শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আট দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বুয়েটে ভর্তি ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবি হলো, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে, আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে এবং ভিন্নমত দমানোর নামে নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে, ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পরও ভিসি

কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে ভিসিকে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে এর জবাব দিতে হবে, হত্যা মামলার খরচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে, এর আগের ঘটনাগুলোর বিচার করতে হবে, ১১ অক্টোবরের মধ্যে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এ ছাড়া, আগামী সাত দিনের মধ্যে বুয়েটে সব ছাত্র রাজনীতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেন তারা।

এদিকে গতকাল বিকেলে ক্যাম্পাসে এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। এর আগে তিনি নিজ কার্যালয়ে প্রোভোস্টদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। ক্যাম্পাসে এসে আবরার হত্যার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে নীতিগত সমর্থন জানান ভিসি। বলেন, তোমরা যে দাবিগুলো করেছো, আমি সেই দাবিগুলো মেনে নিয়েছি। আমি তোমাদের দাবির সঙ্গে নীতিগত সমর্থন জানাচ্ছি। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি।

শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত হলেও সব ক্ষমতা নিজের হাতে নেই জানিয়ে ভিসি বলেন, আবরার হত্যায় জড়িতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুসারে বহিষ্কার করা হবে। একপর্যায়ে ভিসিকে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করেন, আবরার হত্যার ঘটনার পর তিনি কেন ক্যাম্পাসে আসেননি? জবাবে ভিসি বলেন, আমি ক্যাম্পাসে ছিলাম। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কোনো ধরনের ‘সমঝোতা’ ছাড়াই আন্দোলনস্থল ছেড়ে যান ভিসি।

এর আগে গতকাল সকালে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বিকেল ৫টার মধ্যে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে আসার আলটিমেটাম দেন। তিনি না এলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা করা হবে বলেও শিক্ষার্থীরা জানান।

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি, সমর্থন শিক্ষক সমিতির : আন্দোলনের মধ্যেই গতকাল বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে শিক্ষক সমিতি। দুপুরে শহীদ মিনারের পাদদেশে বুয়েটের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদ রানা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, বাবা-মা শিক্ষার্থীদের আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছি। এর আগে গতকাল শিক্ষক সমিতির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অতীতে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো নির্যাতন এবং র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ক্রিয় ছিল। যে কারণে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। এর ফলে ফাহাদ হত্যার মতো নির্মম ঘটনা ঘটেছে, যার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।

বিচার চেয়ে সরব ফেসবুক : বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের ঘটনায় প্রতিবাদ, ক্ষোভ জানিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আবরারের নিথর শরীর উঠিয়ে নেওয়ার ভিডিও এখন ফেসবুকে ভাইরাল। সেই ভিডিওতে খুনিদের মুখও স্পষ্ট। আবরারকে কোথায় ডেকে নেওয়া হয়, কখন ডেকে নেয়, কারা ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, সবকিছুই বেরিয়ে আসছে ফেসবুকে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বুয়েট ছাত্র আবরারের অপরাধটা কী? আমি তো বলব আরেকটা বিশ্বজিতের ঘটনা ঘটল। পার্থক্য হলো, বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, আর আবরারকে বুয়েটের হলে। এ ছাড়া তো আমি পার্থক্য দেখি না। দুজনকেই শিবির সন্দেহে বর্বরভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হলো। দুজনই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা। কারও অপরাধ থাকলে পুলিশ, প্রশাসন আছে কেন? আমি বিশ্বজিতের মতো আবরার হত্যারও বিচার চাই। কারা এই হামলাকারী খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক।’ প্রবাসী ফারাবি মাহমুদ লিখেছেন, ‘আমি ছাত্র থাকা অবস্থায় স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে মাইর খাওয়ার থ্রেট খাইছি। আর আমার হলের ছয় বছরের জুনিয়রকে পিটিয়ে মেরেই ফেলল! জানি, বিচার নাই, তবুও বিচার চাই! চিৎকার করে বিচার চাই।’

প্রকৌশলী চমক হাসান লিখেছেন, ‘কেউ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে এইটুকু নিশ্চিত। আমি এই জঘন্য হত্যাকা-ের বিচার চাই।’

ছাত্রদলের নিন্দা ও দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা : ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ছাত্রদল সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল। একই সঙ্গে দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তারা। আজ বুধবার দেশের সব জেলা, মহানগর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং আগামীকাল বৃহস্পতিবার সব থানা, পৌর ও কলেজগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

বিক্ষোভ প্রতিবাদে উত্তাল সারা দেশ : বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে উত্তাল সারা দেশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে অতিদ্রুত খুনিদের গ্রেফতার ও তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। দেশের সব পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, ময়মনসিংসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেছে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হকসহ বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এসে নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করেন। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে-

চট্টগ্রাম ব্যুরো : ফাহাদ হত্যার বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নগরীর ষোলশহর এলাকায় বিক্ষোভের ডাক দেয়। তা ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী খালেদ সাইফুল্লাহ প্ল্যাকার্ড লিখে একাই আন্দোলনে নেমেছেন।

রাজশাহী ব্যুরো : হত্যার বিচার চেয়ে মহাসড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে উত্তাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। গতকাল বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। পরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে রাস্তার দুপাশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এদিকে অবরোধ কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দিলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।

কুমিল্লা : গতকাল সকালে কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড়ে আবরার বিচার দাবিতে প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন শিক্ষার্থীরা। মানবন্ধনে বক্তারা, আবরার হত্যার দ্রুত বিচার এবং দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সন্ত্রাসমুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

বরিশাল : হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় সরকারি ব্রজমোহন কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে প্রধান সড়কে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় সড়কের পাশে মানববন্ধন করেন তারা। এর আগে নগরীর সদর রোডে অশ্বিনী কুমার হলের সামনে সমাবেশ ও মানববন্ধন করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।

বগুড়া : গতকাল দুপুরে শহরের সাতমাথায় ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা শাখার উদ্যোগে এ মানববন্ধন থেকে হত্যায় জড়িতদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

গাজীপুর : হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) শিক্ষার্থীরা।

টাঙ্গাইল : গতকাল সকালে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা।

সাভার : গতকাল দুপুর ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। অবরোধের ফলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

যশোর : আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। যশোরের সাধারণ ছাত্র পরিষদের আয়োজনে দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত এ মানববন্ধন হয়।

রংপুর : ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশের মতো রংপুরও উত্তাল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সমাবেশ, সড়ক অবরোধ করেছেন।

পটুয়াখালী : গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় পটুয়াখালী সরকারি কলেজের প্রধান ফটকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। পরে বিক্ষোভ মিছিল কলেজ রোড এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা।

রাজবাড়ী : গতকাল দুপুর ১২টার দি?কে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছাত্রলীগ সদস্যদের গ্রেফতার ও বিচা?র দাবিতে রাজবাড়ী?তে মানববন্ধন করেছে ছাত্র ইউনিয়ন।

নোয়াখালী : গতকাল সকাল ১০টার দিকে টাউন হল মোড়ে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে নোয়াখালীতে মানববন্ধন করতে গিয়ে পুলিশি বাধায় পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় লাঠিচার্জ করে ও ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।

 

"