বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে দারিদ্র্য সমহারে কমেনি

অগ্রগতি হবে দুই বছরের মধ্যে : অর্থমন্ত্রী

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও দেশের সব অঞ্চলে দারিদ্র্য কমার হার সমান নয়; কমার গতিও শ্লথ। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ প্রোভার্টি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে অর্থনীতির গতি বাড়লেও দারিদ্র্যবিমোচনের গতি কমেছে। বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাটি বলছে, ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের পূর্ব এবং পশ্চিমের বিভাগগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ঐতিহাসিক পার্থক্য আবার ফিরে এসেছে। তবে দারিদ্র্যবিমোচনে সরকার সঠিক পথেই রয়েছে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, সরকার দেশ থেকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করতে রীতিমতো যুদ্ধ করছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।

উল্লিখিত সময়ে পশ্চিমের রংপুর বিভাগে দারিদ্র্য বেড়েছে, রাজশাহী ও খুলনায় পরিস্থিতির পরিবর্তন নেই। অন্যদিকে চট্টগ্রামে দারিদ্র্য কমেছে পরিমিতভাবে, বরিশাল, ঢাকা ও সিলেটে কমেছে দ্রুতগতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের উপস্থিতিতে গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মারিয়া ইউজেনিয়া জেননি প্রতিবেদনের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে বলেন, ২০১০-১৬ সময়কালে বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যাপক উন্নতি করেছে। বিশেষ করে শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি এই উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। এসময়কালের মধ্যে বাংলাদেশে ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচ্য সময়ে যে হারে দারিদ্র্যবিমোচন হয়েছে তা ২০০৫-১০ সময়ের তুলনায় কম।

২০০৫-২০১০ সময়ে যেখানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছে, সেখানে ২০১০-২০১৬ সময়ে দেশে দারিদ্র্যবিমোচন হয়েছে বছরে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে।

জেননি দারিদ্র্য হার কমার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০১০-২০১৬ সময়ে দেশে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য কমেছে বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেটে।

২০১০ সালে বরিশালে দারিদ্র্য হার ছিল ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৪ শতাংশে। একইভাবে চট্টগ্রামের দারিদ্র্য হার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে। আর সিলেটের দারিদ্র্য হার ২৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে।

উল্টো দিকে দেখা গেছে, ২০১০ সালে রংপুরে যেখানে দারিদ্র্য হার ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল, উল্লিখিত সময়ে তা বেড়ে ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। দারিদ্র্য কমার এই চিত্রে তিনি পূর্ব-পশ্চিমের ঐতিহাসিক পার্থক্য ফিরে আসার শঙ্কা দেখছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০-২০১৬ সময়ে দারিদ্র্যবিমোচনের ৯০ শতাংশই হয়েছে গ্রামে। শহরে দারিদ্র্য কমেছে সীমিতভাবে। অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শহরের লোকের অবস্থান প্রায় একই রয়ে গেছে। ফলে জাতীয় দারিদ্র্যবিমোচনের গতি শ্লথ হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, গ্রামাঞ্চলেও দারিদ্র্য কমাতে কৃষি নয়, শিল্প খাতই বেশি অবদান রেখেছে। আলাচ্য সময়কালে কৃষি প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে এবং দারিদ্র্যবিমোচনে এ খাতটি আগের চেয়ে কম অবদান রেখেছে। আর শহরাঞ্চলে উৎপাদন খাত, বিশেষ করে পোশাক খাত দারিদ্র্যবিমোচনে নেতৃত্ব দিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আমাদের হতদরিদ্রের সংখ্যা ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু দারিদ্র্যসীমা এখনো ১৯ থেকে ২০ শতাংশে ঘোরাঘুরি করছে। তবে এ হার নামিয়ে আনতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশে ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার দারিদ্র্যদূরীকরণে সামাজিক নিরপাত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি দারিদ্র্যপ্রবণ নির্দিষ্ট এলাকা ও দরিদ্র গ্রুপকে টার্গেট করে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাই দারিদ্র্যদূরীকরণে আমরা দৃঢ় আশাবাদী।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি মার্সিয়া টেম্বন বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচনে প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে। কিন্তু এখনো প্রতি চারজনের একজন দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে।

দারিদ্র্য কমানোর জন্য, বিশেষ করে দারিদ্র্যের নতুন ক্ষেত্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শহর এলাকায় দারিদ্র্যবিমোচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের অর্ধেকই শহরে বাস করবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলমও বক্তব্য দেন।

 

"