আবরারের মায়ের মাতম

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যার খবরে তার গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজন ও এলাকাবাসী শোকে স্তব্ধ, হতবাক। তার মায়ের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আর বলছেন, এত মেধাবী, এমন শান্ত ছেলেটিকে হত্যা করল কারা? ফাহাদের বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের

সড়কে (পিটিআই রোড)। সেখানে গিয়ে এই দৃশ্য দেখা যায়।

বাবা বরকতুল্লাহ বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের নিরীক্ষক কর্মকর্তা ছিলেন। মা রোকেয়া খাতুন একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে ফাহাদ বড়। ছোট ভাই আবরার ফায়াজ ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেও ঢাকা কলেজের হোস্টেলে থাকে। বুয়েটের শেরেবাংলা হলের কাছেই তার হোস্টেল।

পারিবারিক সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফের বাড়ির পেছনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ব্র্যাক কর্মী বরকতুল্লাহ-রোকেয়া দম্পতির বড় ছেলে। গ্রামের বাড়ি কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। ফাহাদ ২০১৫ সালে কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন ঢাকা নটর ডেম কলেজে। সেখান থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হন। বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা দিয়ে মেডিকেলে চান্স পেলেও পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ে (বুয়েট) ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস বিভাগে (ইইই) ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন। সামনে পরীক্ষা, তাই ফাহাদ রোববারই বাড়ি থেকে তার প্রিয় ক্যাম্পাস বুয়েটে যান। রাত ৩টার দিকে হলের এক বড় ভাইয়ের মোবাইল কলে জানতে পারেন ফাহাদ আর নেই। আকস্মিক এই হৃদয়বিদারক ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের স্বজনরা।

ফাহাদের ভাই ঢাকা কলেজ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আবরার ফাইয়াজ জানান, যারা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তারাই অপপ্রচার চালাচ্ছেন ফাহাদ ছাত্রশিবির করত। প্রকৃতপক্ষে ফাহাদ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, কিন্তু রাজনৈতিক কোনো সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করে।

ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, রোববার সকালে আমি তাকে নিজে ঘুম থেকে ডেকে তুলি। সে ঢাকায় রওনা দেয়। মাঝে তিন-চারবার ছেলের সঙ্গে কথা হলো আমার। বিকাল ৫টায় হলে পৌঁছে ছেলে আমাকে ফোন দেয়। এরপর আর কথা হয়নি। রাতে অনেকবার ফোন দিয়েছিলাম, ফোন ধরেনি। ছেলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার দাবি জানান তিনি।

পরিবার বলছে, ফাহাদের কোনো শত্রু ছিল না। তাদের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক। তাদের সন্তানকে কেন এভাবে জীবন দিতে হলো, বুঝে উঠতে পারছেন না।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ১০ দিন আগে ছুটিতে দুই ভাই বাড়িতে এসেছিল। ২০ তারিখ পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে চেয়েছিল আবরার। তবে সামনে পরীক্ষা, পড়া হচ্ছে না বলে রোববার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় সে।

কুষ্টিয়া শহরের বাড়ির আশপাশের লোকজন ফাহাদ ও তার পরিবার সম্পর্কে খুব বেশি জানাশোনা নেই প্রতিবেশীদের। তবে ফাহাদের গ্রামের বাড়ি কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে ফাহাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী সবাই খুব পরিচিত। একসময় এরা সবাই কৃষি পরিবার ছিল। পরে এদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। ফাহাদের বাবার গ্রামের ঘরবাড়ি এখনো আছে সেখানে।

ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক স্বপন বলেন, ফাহাদ লেখাপড়ায় বরাবরই ভালো ছিল। কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে পড়ার সূত্রে বাবা বরকতুল্লাহ কুষ্টিয়া শহরের বসবাস শুরু করেন। মাঝে মধ্যে ফাহাদও গ্রামের বাড়িতে এসেছে। জানামতে, ছেলেটি খুব ভালো এবং ওকে কোনো দিন রাজনীতিতে যুক্ত হতে দেখিনি।

 

"