বুয়েট ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

* ছাত্রলীগের ৯ নেতা আটক * শরীরে জখমের অনেক চিহ্ন * চাপাতি-মদের বোতল জব্দ

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাবি প্রতিনিধি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার নাম আবরার ফাহাদ (২৪)। তিনি বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (ইইই) বিভাগের লেভেল-২ এর টার্ম-১ এর ছাত্র ছিলেন। গত রোববার রাত ৩টার দিকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের নিচতলা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ওই হলের ১০১১নং কক্ষে থাকতেন। তাকে হত্যা করা হয় ২০১১নং কক্ষে। সেই কক্ষ থেকে রক্তমাখা লাঠি, ক্রিকেট খেলার স্টাম্প, চাপাতিসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে ছাত্রলীগের ৯ নেতাকে। তবে ওই কক্ষে চারজন ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজনই পলাতক; একজন আগেই ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছেন। পুলিশ ও তার পরিবার বলছে, আবরারের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। শরীরের পেছনে, বাম হাতে ও কোমর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত আঘাতের কালো দাগ ছিল। পুলিশের ক্রাইম সিন ইউনিট, মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, চকবাজার থানা পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র বলছে, গত ৫ অক্টোবর ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। সেখানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি ও গ্যাস চুক্তির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন তিনি। সেই স্ট্যাটাস ইশতিয়াক মুন্নার নজরে আসে। তিনি একই হলের শিক্ষার্থী বুয়েট শাখা ছাত্রলীগ সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু, উপ-দফতর সম্পাদক মোস্তফা রাফি, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা, ক্রীড়া সম্পাদক মেজবাউল ইসলাম জিয়ন ও তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকারকে বিষয়টি জানিয়ে ফাহাদকে ডেকে আনার নির্দেশ দেন।

এরা সবাই ১৬ ও ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে দুজন গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ফাগাদকে ডেকে ২০১১নং কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে নেওয়ার পর ফাহাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তার ফেসবুক মেসেঞ্জার চেক করেন মুন্না। এ সময় ফাহাদ শিবিরের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ আনা হয়। ফাহাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করলে শুরু হয় স্টাম্প দিয়ে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন। বেধরক পেটানো হয় তাকে। মার খেয়ে একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়লে কোলে করে মুন্নার (২০০৫ নং) কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার আরো অবনতি হলে দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মধ্যবর্তী জায়গায় অচেতন ফাহাদকে নিয়ে যান তারা।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, অচেতন আবরার চিকিৎসার জন্য হল প্রভোস্ট ও চিকিৎসককে খবর দেয় ছাত্রলীগের কর্মীরা। কিন্তু এরই মধ্যে প্রাণ হারান তিনি। চিকিৎসক এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন। তখন কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দেয়। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ আমাদের কাছে রয়েছে। ফাহাদ হত্যাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই থাক তা তদন্তে কোনো প্রভাব পড়বে না। হত্যাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।

আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মোট ৯ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের পদে আছেন। আটকরা হলো বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি সম্পাদক মুহতাসিন ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, তানভীরুল আবেদীন ইথান (১৬তম ব্যাচ), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসান রবিন, গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক হাসান মুন্না, উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা, তানভির, আল জামি ও জিসান। গতকাল সোমবার সকালে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল এবং সহসভাপতি ফুয়াদ হোসেনকে আটক করে পুলিশ। পরে বিকাল ৩টার দিকে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার ও ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেফতাহুল ইসলাম জিয়নকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ছাড়া হলের অনেক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ২০১১নং কক্ষে চারজন শিক্ষার্থী থাকেন। এর মধ্যে তিনজন পলাতক। তারা হলো বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপ-সম্পাদক ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা, উপ-দফতর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুজতাবা রাফিদ, সমাজসেবাবিষয়ক উপ-সম্পাদক ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ইফতি মোশারফ ওরফে সকাল। প্রত্যয় মুবিন নামের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী দুর্গাপূজার ছুটিতে দুই দিন আগে গ্রামের বাড়িতে গেছেন।

এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে গতকাল সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে আবরারের ময়নাতদন্ত হয়েছে। ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ লাশের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি বলেন, ময়নাতদন্তে তার শরীরে জখমের অনেক চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছেলেটিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান। জড়িতদের বিষয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান তদন্ত কমিটির বিষয়ে এ তথ্য জানান। এ সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

আবরারের মামাত ভাই জহিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আবরারের সঙ্গে কারো কোনো শত্রুতা ছিল না। সে কুষ্টিয়ায় গিয়েছিল। গত রোববার বিকালে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এসে হলে উঠে। তারপর মধ্যরাতে খবর পাই ভাই মারা গেছে। চকবাজার থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন বলেন, রাত পৌনে ৩টার দিকে বুয়েট কর্তৃপক্ষ আমাদের ফোন করে বিষয়টি জানায়। পরে আমরা গিয়ে শেরেবাংলা হলের বাইরে নিচতলা থেকে লাশ উদ্ধার করে ঢামেকে নিয়ে আসি।

 

ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ : বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যার সময়ে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ঘটনাস্থলের আশপাশের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা বের করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি, সিসিটিভির ফুটেজে মুছে ফেলা হলেও সেটা রিকভার করা সম্ভব। তাই সিসিটিভির ফুটেজ না দেখানো পর্যন্ত হলের প্রভোস্ট কার্যালয়ের সামনে থেকে না সরার ঘোষণা দিয়েছেন ফাহাদের ব্যাচের একাধিক শিক্ষার্থী।

ফাহাদ হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। নামপ্রকাশ না করার শর্তে তার কক্ষের একজন বলেন, হলে রাতে যখন আসি তখন শুনি তাকে (ফাহাদ) আমাদের ব্যাচমেটরা নিয়ে গেছে। এজন্য আমরা কিছু মনে করিনি। পরে ১৭ ব্যাচের আরাফাত আমাদের খবর দেয় যে, আবরার সিঁড়িতে পড়ে আছে। তখন আমরা গিয়ে দেখি তোশকের ওপর তার মরদেহ।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই শিক্ষার্থী বলেন, তাকে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে দেখিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাশ্মীর এবং ভারত নিয়ে স্ট্যাটাস দিতে দেখেছি। এছাড়া মাঝে মাঝে তাবলিগ জামাতের প্রোগ্রাম যেত। সেটা তো দোষের কিছু নয়।

ফাহাদকে মারধর করা হয় হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে। মারধরের সময় ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু। তিনি বলেন, ‘ফাহাদকে শিবির সন্দেহে রাত ৮টার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়। সেখানে আমরা তার মোবাইলে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার চেক করি। ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেজে তার লাইক দেওয়ার প্রমাণ পাই। সে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাই। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বুয়েট ছাত্রলীগের উপ-দফতর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজতবা রাফিদ, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা। পরবর্তী সময়ে প্রমাণ পাওয়ার পরে চতুর্থ বর্ষের ভাইদের খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার সেখানে আসেন। একপর্যায়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে আসি। এরপর হয়তো তারা মারধর করে থাকতে পারেন। পরে রাত ৩টার দিকে শুনি ফাহাদ মারা গেছে।’

অপরদিকে ২০১১ কক্ষে থাকা তৃতীয় বর্ষের সবাই হল ছেড়ে চলে গেছেন। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে আলামত উদ্ধার করছেন। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুয়েট ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ও শেরেবাংলা হলের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রাসেল ও সহ-সভাপতি মুস্তাকিম ফুয়াদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হেফাজতে নিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে চাননি ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায়। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দুজন শিক্ষার্থীকে নেওয়া হয়েছে, তারা এ হলের শিক্ষার্থী। তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে এখনই কিছু বলতে চাচ্ছি না।

কৃষ্ণপদ রায় বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছি। আমরা যতগুলো সিসিটিভির ফুটেজ আছে সবগুলো সংগ্রহ করেছি। ফুটেজগুলো অত্যন্ত স্বচ্ছ। এই হত্যাকান্ডে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কে কোনো দলের এসব বিবেচনায় আসবে না।

 

"