দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশ্বে দৃষ্টান্ত : হাসিনা * বন্ধুত্বের লক্ষ্য কল্যাণ ও অগ্রগতি : মোদি

৭ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক

অনন্য উচ্চতায় ঢাকা-দিল্লি বন্ধুত্ব

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও কলকতা প্রতিনিধি

ভারত-বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। এই দুই নিকটতম প্রতিবেশী দেশ এবং তার প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। এই ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক পারস্পরিক সমমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এখন এই সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রত্যয়ী দুদেশের নেতারা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্পর্ক বিশ্ববাসীর কাছে সু-প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণ ও সরকারের অপরিসীম অবদানের কথা আমরা চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অবদান মাইলফলক হয়ে থাকবে। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র বলেন, সারা বিশ্বে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর মধ্যে সহযোগিতার অনন্য উদাহরণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। আমাদের বিশেষ এই বন্ধুত্বের লক্ষ্য হলো দুদেশের জনগণের কল্যাণ ও অগ্রগতি। গতকাল শনিবার নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এ কথা বলেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে দুদেশের সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয় এবং পরে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তি ও সমঝোতাপত্র বিনিময় হয়। এ ছাড়া দুই প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে দ্বিপক্ষীয় তিনটি প্রকল্পও উদ্বোধন করেন।

বৈঠকে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত। সেই পানি যাবে ত্রিপুরার সাবরুম শহরে পানি সরবরাহ প্রকল্পে। বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই হয়েছে। বাংলাদেশকে দেওয়া ভারতের ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি চুক্তি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব হায়দরাবাদের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিনিময় এবং যুব উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির যৌথভাবে উদ্বোধন করা প্রকল্পগুলো হলোÑ খুলনায় ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ-ভারত প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে বিবেকানন্দ ভবন এবং বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় এলপিজি আমদানি প্রকল্প।

প্রকল্পগুলো উদ্বোধন করে শেখ হাসিনা বলেন, বিগত এক দশকে আমাদের উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রথাগত সহযোগিতা প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন ও অপ্রচলিত খাত যেমন ব্লু ইকোনমি ও মেরিটাইম, পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ গবেষণা, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ রফতানি ও সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি খাতে উভয় দেশ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছে। এসব বহুমুখী ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার ফলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশ্ববাসীর সামনে সু-প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

এলপিজির প্রকল্প নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এটা আমাদের উভয় দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করবে বলে আমি মনে করি। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর জ্বালানি চাহিদা পূরণ অনেকাংশে সহজ হবে বলে আশা করছি।

খুলনার বিআইপিএসডিআই বাংলাদেশের ওই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে অবদান রাখবে বলে আশা করেন শেখ হাসিনা।

তিনি আশা করেন, ভারত সরকারের আর্থিক অনুদানে স্থাপিত রামকৃষ্ণ মিশনের বিবেকানন্দ ভবন শিক্ষা বিস্তারে সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ভূমিকা রাখবে।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ব্যাপারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে মূল্য দেয়। সারা বিশ্বের মধ্যে দুই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর মধ্যে সহযোগিতার অনন্য উদাহরণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। আমাদের আজকের এই আলোচনা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরো জোরালো করবে। আমাদের বিশেষ এই বন্ধুত্বের লক্ষ্য হলো দুই দেশের জনগণের কল্যাণ ও অগ্রগতি। আজ (গতকাল) তিনটি প্রকল্প যোগ হয়ে এক ডজন যৌথ প্রকল্পের উদ্বোধন করলাম। এই প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য আমাদের নাগরিক জীবনমানকে উন্নত করা। এটা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল মন্ত্র। শীর্ষ বৈঠকের পর হায়দরাবাদ হাউসে শেখ হাসিনা তার সম্মানে দেওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

এদিকে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘আরো উচ্চতায়’ নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে ভারত। ভারত ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’ দেয় বাংলাদেশকেÑ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে এ কথা জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ কথা বলেন জয়শঙ্কর।

বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এক টুইট বার্তায় বলেন, জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। জয়শঙ্করের বক্তব্য উদ্ধৃত করে রবীশ কুমার বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অত্যন্ত আন্তরিক আলোচনা হয়েছে।

বৈঠককালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী উপস্থিত ছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে গত বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ রোববার তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

 

"