আরো ৪ ক্লাবে অভিযান

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুয়ার আসর বন্ধে র‌্যাবের টানা পঞ্চম দিনের অভিযানের মধ্যে এবার রাজধানীর মতিঝিল এলাকার চারটি ক্লাবে অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একযোগে মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা ও ভিক্টোরিয়া ক্লাবে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে কাউকে গ্রেফতার করা না গেলেও বিপুল পরিমাণ ক্যাসিনোর সরঞ্জাম, মদ আর নগদ টাকা জব্দ করেছে পুলিশ। যদিও গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু অভিযানের পর ঢাকাসহ সারা দেশের সবকয়টি ক্লাব বন্ধ রয়েছে। সেসব ক্লাবে যারা কাজ করতেন, ক্লাবে তালা ঝুলিয়ে তারাও পালিয়ে গেছেন। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শিবলী নোমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভিক্টোরিয়া ক্লাব থেকে বিভিন্ন ধরনের জুয়া খেলার ৯টি বোর্ড, ১ লাখ টাকা, বিপুল পরিমাণ তাস, জুয়ায় ব্যবহৃত চিপস ও মদ পাওয়া গেছে। মোহামেডানে পাওয়া গেছে দুটো রুলেট টেবিল, ৯টি বোর্ড, বিপুল পরিমাণ কার্ড, ১১টি ওয়্যারলেস সেট ও ১০টি বিভিন্ন ধরনের চাকু। আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবেও বাকারা এবং রুলেট টেবিলসহ বিভিন্ন জুয়ার সরঞ্জাম পেয়েছে পুলিশ। ক্যাসিনো বোর্ডের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তাস খেলার সামগ্রী, জুয়ার বোর্ড, জুয়া খেলার সামগ্রী এবং মদ, সিসা জব্দ করা হয়। তবে সব ক্লাবই বন্ধ ছিল বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এদিকে পুলিশের নাকের ডগায় কীভাবে এসব ক্যাসিনো এত দিন চলে আসছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যখনেই আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, তখনই আমরা অভিযান চালিয়েছি। এর আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।’

গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ঢাকায় যুবলীগ নেতাদের ‘৬০টি ক্যাসিনো চালানোর’ খবর আসে সংবাদমাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের চার দিনের মাথায় ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্যাসিনোতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব।

র‌্যাবের অভিযানে এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, যুবলীগ নেতা ও আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীম, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সদস্য ও কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজসহ বেশ কয়েকজনকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়। এসব অভিযানে জব্দ করা হয়েছে নগদ টাকা, মদ, বিয়ার, ইয়াবা ও ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জাম। এরপর র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে ফকিরাপুলের ‘ইয়ংমেন্স ক্লাব’ ক্যাসিনো, বনানীর ‘গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ’ ক্যাসিনো, গুলিস্তানের ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র’ ক্যাসিনো এবং মতিঝিলের আরামবাগে ‘ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব’ ক্যাসিনো সিলগালা করে দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত শনিবার চট্টগ্রামের পাঁচটি ক্লাবে একযোগে অভিযান শেষে তিনটি ক্লাবে জুয়ার আসর চালানোর প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয় র‌্যাবের পক্ষ থেকে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবে ক্যাসিনো চলে আসছে ৭-৮ বছর ধরে। এর মধ্যে ইয়ংমেন্স ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বাকি পাঁচটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের লোকজন। তবে সম্রাট নিজে সরাসরি ক্যাসিনো দেখাশোনা করতেন না। তার ক্যাসিনো চালাতেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক। এক বছর আগে পল্টনের প্রীতম-জামান টাওয়ারে ক্যাসিনো চালু করেছিলেন। পরে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাসিনোর দুই হোতা আবু কাওসার ও মমিনুল হক এখন বিদেশে রয়েছেন। আর যুবলীগ নেতা সম্রাট গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে র‌্যাবের অভিযানের দিন থেকে কাকরাইলে নিজের কার্যালয়েই অবস্থান করছেন। তিনি শত শত যুবলীগ কর্মী দ্বারা পরিবেষ্টিত আছেন।

বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্লাবের কর্মকর্তাদের দাবি, ভয় দেখিয়ে ক্লাবের জায়গা দখল করে ক্যাসিনো বাণিজ্য গড়ে তোলা হয়েছে। যুবলীগ নেতাদের এ কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশি পাহারায় রাতভর ক্যাসিনো চলেছে। নির্বিঘেœ ক্যাসিনো বাণিজ্য চালাতে সহায়তা করেছে স্থানীয় পুলিশ। গ্রেফতার করতে হলে তাদেরও ধরতে হবে বলে জানিয়েছেন ক্লাব সংশ্লিষ্টরা। গত শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ সভায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। ডিএমপি সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি বলেন, অবৈধ ক্যাসিনো পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছে। এর হাত থেকে রক্ষা পেতে অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জুয়া বা ক্যাসিনো বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। শুধু ক্যাসিনো নয়, বিভিন্ন সেক্টরে এই অভিযান চলবে। সরকারের প্রভাব খাটিয়ে যারা অন্যায় কাজে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাদের তত্ত্বাবধানে চলত এসব ক্যাসিনো : ক্লাবপাড়ার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবও যুবলীগের প্রভাব খাটিয়ে দখল করেছিলেন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এই ক্লাবের চেয়ারম্যান ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য কমরেড রাশেদ খান মেনন। তার আগে ক্লাবের সভাপতি ছিলেন মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন। তাকে হটিয়ে খালেদ মাহমুদ অনেকটা জোর করে ক্লাবের দায়িত্ব নিয়ে ক্যাসিনো চালাতে শুরু করেন।

আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবের চরিত্র একই রকম। সরকার বদলের পর এই দুটি ক্লাবেরই সভাপতি হন আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ। তিনি অন্তত পাঁচটি ক্লাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরীর সম্রাটের ঘনিষ্ঠ লোক হলেন এই সাঈদ। তবে আরামবাগ ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী শাহাজাদুল ইসলাম।

ক্যাসিনোর কারণে বন্ধ হওয়া আরেক ক্লাব ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের সভাপতি কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কায়সার। ক্লাবপাড়ার লোকেরা বলেন, ওয়ান্ডারার্স ডুবেছে ক্যাসিনোয়। এই ক্লাবে ক্যাসিনো চালান রশিদুল হক। ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন কাশেম নামের এক ব্যবসায়ী। মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া ক্লাব চালান। অভিযোগ আছে, তাকে চাপের মুখে ফেলে মমিনুল হক সেখানে ক্যাসিনো চালু করেন।

এদিকে অভিযানের পর সবকয়টি ক্লাবই বন্ধ দেখা গেছে। ক্লাবের বেশির ভাগ কর্মকর্তা ফোন বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছেন। গত শুক্রবার ধানমন্ডি ক্লাবে অভিযান চালায় র?্যাব। একই দিন অবৈধ জুয়ার আসরের জন্য কারওয়ানবাজারের প্রগতি ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। তবে এই ক্লাব থেকে জুয়া খেলার অভিযোগে কাউকে আটক করেনি র?্যাব। তেজগাঁও বিজি প্রেস মাঠে বিজি প্রেস স্পোর্টিং অ্যান্ড রিক্রিয়েশন ক্লাব নামের একটি ক্লাব রয়েছে। এই ক্লাবে এক সময় জুয়া চলত। ক্লাব দুটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত। কয়েক বছর আগে এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

"