আলোচিত জি কে শামীম আটক

* অফিসে মিলল ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর * নগদ পৌনে ২ কোটি টাকা জব্দ

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

এবার আলোচিত ঠিকাদার ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে আটক করেছে র‌্যাব। এ সময় তার ছয়জন দেহরক্ষীকেও আটক করা হয়। তিনি রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। গতকাল শুক্রবার প্রথমে ১১৩ নম্বর নিকেতনে শামীমকে তার বাসা থেকে আটক করা হয়। পরে পাশের ১১৪ নম্বর নিকেতনে জি কে বিল্ডার্স এবং জিকেবি কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড শামীমের বাণিজ্যিক কার্যালয়। সেখানেও দিনভর অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব।

অভিযানে শামীমের অফিস থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, মায়ের নামে ১৪০ কোটি এবং নিজের নামে ২৫ কোটি টাকার এফডিআরের (ব্যাংকে স্থায়ী আমানত) কাগজপত্র, নিজের নামে লাইসেন্স করা একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও দেহরক্ষীদের সাতটি শটগান এবং বিদেশি মদের কয়েকটি বোতল জব্দ করা হয়। গতকাল সকাল থেকেই তার বাসা ও অফিসে চালানো অভিযান শেষ হয় সন্ধ্যা ৭টায়। অভিযান শেষে তাকে নিকেতনের জি কে বিল্ডার্স কার্যালয় তাকে র‌্যাব-১-এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। র‌্যাবের দাবি, তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেসব তদন্ত করছি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে।

শামীমের পিএস দিদারুল আলমের দাবি, শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্যই অফিসে টাকা এনে রাখা হয়েছিল, উদ্ধারকৃত সব অর্থ ও অস্ত্র বৈধ। এদিকে জি কে শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক বলে লোকমুখে শোনা গেলেও সংগঠনটির শিক্ষা সম্পাদক মিজানুল ইসলাম মিজু বলছেন, শামীম যুবলীগের কেউ নন, তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। যুবলীগের চেয়ারম্যানও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শামীম যুবলীগের কোনো কমিটিতে নেই। জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে শামীম ছিলেন ঢাকা মহানগর যুবদলের সহসম্পাদক এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ।

অভিযানের সময় টেলিভিশনের ক্যামেরাসহ সাংবাদিকদের দেখে হতভম্ব হয়ে যান শামীম। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে ছবি তুইবেন না, আমাকে বেইজ্জতি করবেন না। আমার একটা সম্মান আছে। এখানে যা হচ্ছে, আপনারা দেখছেন। কিন্তু আমাকেও আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দিতে হবে।’ এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘প্লিজ ছবি তুলবেন না।’ অভিযানের পুরো সময়টুকু নিজেকে ক্যামেরা থেকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন শামীম। কখনো দাঁড়িয়ে, চেয়ারে বসে, হাত দিয়ে মুখ ঢাকছিলেন তিনি। আবার এটা-ওটা খোঁজার জন্য দীর্ঘক্ষণ টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়েও রাখেন।

এদিকে অভিযানের ফাঁকে এক ব্রিফিংয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তারা শামীমের বাসা ও অফিসে অভিযান চালিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেসব তদন্ত করছি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে।’ এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এফডিআরের টাকাগুলো বিভিন্ন অবৈধ সোর্স থেকে এসেছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনে তদন্তকাজ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘জি কে শামীমের অফিসে ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের কাগজ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে শামীমের মায়ের নামে রয়েছে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর। তবে তার মায়ের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। আমাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে, কিছু অবৈধ সোর্স থেকে তার এফডিআরের টাকাগুলো এসেছে। শামীমকে আদালতে এফডিআরগুলোর সোর্স বৈধ প্রমাণ করতে হবে।’

সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে গ্রেফতার করতে অভিযান পরিচালনা করে। কাউকে নাজেহাল করতে অভিযান চালানো হয় না। আমাদের কাছে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও এফডিআরের অবৈধ সোর্সের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলো তিনি মিথ্যা প্রমাণ করতে পারলে ছাড়া পাবেন।’

জব্দ অস্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জব্দ অস্ত্রগুলো বৈধ। তবে অভিযোগ রয়েছে এগুলো অবৈধ কাজে ব্যবহার হতো। এ জন্যই আমরা সেগুলো জব্দ করেছি।’ শামীমের রাজনৈতিক পরিচয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না, তা নির্ধারণ করবে তার দল ও নেতারা। এ দায়িত্ব আমাদের নয়।’

র‌্যাব সূত্র জানায়, যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার স্বীকারোক্তিতে বিভিন্ন অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে জি কে শামীমের নামও ওঠে আসে। এ তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে আটক করে অভিযান চালানো হয়। এর আগে গত বুধবার রাজধানী ফকিরাপুলে অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গুলশানে তার নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে তার পরিচালিত অবৈধ ক্যাসিনোতেও অভিযান চালানো হয়। খালেদ এখন সাত দিনের পুলিশি রিমান্ডে আছেন। তার দেওয়া তথ্যেই নিকেতনে জি কে শামীমের কার্যালয় ও কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। সম্প্রতি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপরই ছাত্রলীগের পদ হারান শোভন-রাব্বানী। এরপর আটক হন খালেদ ও আজ (গতকাল) শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব।

 

"