মেট্রোরেলের নিরাপত্তায় আসছে আলাদা পুলিশ

সার্বিক অগ্রগতি ৩০ শতাংশ

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেট্রোরেলের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের আলাদা ইউনিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে গতকাল সোমবার গণভবনে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেখার সময় এই নির্দেশনা দেন সরকারপ্রধান। এদিকে মেট্রোরেল প্রকল্পের ২০ কিলোমিটার উড়ালসড়কের মধ্যে এখন পর্যন্ত চার কিলোমিটারের বেশি দৃশ্যমান। বাকি ১৬ কিলোমিটার সড়কে চলছে নানা কর্মযজ্ঞ। কোথাও পাইলিং, কোনো কোনো স্থানে পিলার, কয়েকটি স্থানে চলছে উড়ালসড়কের সø্যাব (যেটা দিয়ে ট্রেন চলবে) বসানোর কাজ। দেশের বাইরে জাপানের কারখানায় ইঞ্জিন-কোচ তৈরির কাজও চলমান। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে মেট্রোরেল চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনের অনুষ্ঠানে বলেন, মেট্রোরেলের নিরাপত্তার জন্য মেট্রোরেল পুলিশ থাকবে। তাদের ট্রেনিং দিতে হবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার সাবেক পুলিশ কমিশনার বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান মিয়াকে নতুন এ ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

এ সময় পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক। তিনি বলেন, দেশের প্রথম মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজের সার্বিক গড় অগ্রগতি ৩০ দশমিক ০৫ শতাংশ।

প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে কাজের অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ। এছাড়া দ্বিতীয় পর্যায়ে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশে কাজের অগ্রগতি ২৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল সিস্টেম ও রোলিং স্টক (রেলকোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকার যানজট নিরসন ও পরিবেশ উন্নয়নে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) বা মেট্রোরেলের পরিকল্পনা, সার্ভে, ডিজাইন, অর্থায়ন, নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০১৩ সালের ৩ জুন ডিএমটিসিএল গঠন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা নেয় সরকার।

এর মধ্যে এমআরটি-৬ এ উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে। প্রথম পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় ধরা হলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরে তা এগিয়ে আনা হয় বলে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন। এই প্রকল্পের প্রথম ধাপ উত্তরা থেকে আগারগাঁওয়ে এ বছরের শেষ নাগাদ ট্রেন চালুর আশা প্রকাশ করছেন সরকারের কর্মকর্তারা। দ্বিতীয় ধাপ আগারগাঁও থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলে গত অক্টোবরে বলেছিলেন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী জাপান সরকারের দাতাসংস্থা জাইকার একটি প্রতিনিধিদল গত ফেব্রুয়ারিতে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সঙ্গে সাক্ষাতে এমআরটি-৬ প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালে শেষ হবে বলে জানিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের অগ্রগতি ৩৯ থেকে ৯৩ শতাংশ। শুরুতে সরকার উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ চলতি বছরের ডিসেম্বরে চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কাক্সিক্ষত গতিতে কাজ না এগোনোর কারণে পুরো সড়কই ২০২১ সালে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত মেট্রোরেলের দূরত্ব ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার। ১৬টি স্থানে স্টেশন থাকবে। এর পুরোটাই হবে উড়ালসড়কে, মাটির ১৩ মিটার ওপর দিয়ে। এ জন্য প্রথমে উড়ালসড়ক নির্মাণ হচ্ছে। পরে রেলের লাইন বসানো হবে। কর্তৃপক্ষ বলছে, শব্দ নিয়ন্ত্রণের জন্য লাইনের পাশে শব্দনিরোধক দেয়াল থাকবে।

ডিএমটিসিএল সূত্র বলছে, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারের মধ্যে চার কিলোমিটারের কিছু বেশি উড়ালসড়ক দৃশ্যমান হয়েছে। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দূরত্ব ৮ দশমিক ১২ কিলোমিটার। এই পথে পাইলিং ও পিলার তৈরির কাজ চলছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেল বাংলাদেশে প্রথম এবং কারিগরি দিক থেকে এটি একটি জটিল প্রকল্প। ফলে তাড়াহুড়ো করে এর নির্মাণকাজ শেষ করার সুযোগ নেই। তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা দেখাতে হবে।

প্রকল্পের কাজ আটটি ভাগে বা কন্ট্রাক্ট প্যাকেজে (সিপি) ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র উত্তরায় ডিপোর মাটি উন্নয়নের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। বাকি সাতটি ভাগের মধ্যে রয়েছে উত্তরায় ডিপোর অবকাঠামো নির্মাণ, লাইন নির্মাণের তিনটি ভাগ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপন এবং ইঞ্জিন ও কোচ তৈরি। এসব কাজ এখন চলমান।

গণভবনে গতকালের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মেট্রোরেলের প্রতিটি বিষয় মনোযোগ সহকারে প্রত্যক্ষ করেন এবং প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন। খুঁটিনাটি বিষয়গুলোতেও তিনি প্রয়োজনীয় সমাধান ও নির্দেশনা দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য শাহজাহান খান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, সড়ক পরিবহন ও হাইওয়ে বিভাগের সচিবও ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আখতার হোসেন ভূঁইয়া, জাতীয় নিরাপত্তা সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশে জাইকার প্রধান প্রতিনিধি হিতোশি হিরাতার নেতৃত্বে জাইকার একটি প্রতিনিধিদলও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তারাও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন সভায়।

 

"