কৃষকের মুখে আউশের হাসি

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

শরতের নীল আকাশজুড়ে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা। কখনো কালো মেঘ জমাট বাঁধে, কখনো সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়, আবার কখনো সূর্যের দহনজ্বালা। এভাবে পার হয়ে যাচ্ছে শরৎকাল। এর মধ্যে মাঠে-উঠানে কিষান-কিষানির মুখে ফুটে উঠছে আউশের হাসি। এখন তারা মহাব্যস্ত আউশ ধান কাটা ও মাড়াইয়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এবার সারা দেশে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৮১ হেক্টর (৪ লাখ ৫৯ হাজাার ২২৬ বিঘা) জমিতে প্রণোদনা কার্যক্রমের মাধ্যমে জমির জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। প্রণোদনার আওতাধীন জমিতে চাল উৎপাদন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫২ মেট্রিক টন যার মূল্যে ৫৭৮ কোটি ৮৭ লাখ ৫৭ হাজার ৫৪০ টাকা। খড় হবে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন। যার মূল্যে ২৪ কোটি ৬৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪০৬ টাকা। চাল ও খড় বাবদ মোট আয় ৬০৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৪৫ টাকা।

আগের দিনে দেশে আউশ ও আমন ধানের চাষ হতো। দেশি জাতের আউশে ফলন কম হতো। এরপর বোরো চাষ শুরু হলে চাষি আউশ ধানের চাষ কমিয়ে দিয়ে বোরো চাষে ঝুঁকতে থাকে। কারণ বোরো ধানের ফলন বেশি হয়। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও কম থাকে। এক পর্যায়ে আউশ চাষ উঠে যাওয়ার মতো অবস্থায় আসে। বর্তমান সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয় ফের আউশ ধানের চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। অউশ ধান চাষিদের প্রণোদনা প্রদান শুরু করে। এতে ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। চাষি নতুন করে আউশ চাষ বাড়িয়ে দেয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ক্রপ উইংয়ের উপপরিচালক মো. আইয়ুব আলি বলেন, উচ্চফলনশীল আউশ আবাদ করা হচ্ছে। এর ফলন বোরো ধানের কাছাকাছি। আর চাষে খরচ কম। বৃষ্টির পানিতে চাষ হয়। এতে সেচ খরচ কম হয়।

আমাদের বরিশাল প্রতিনিধি জানান, কৃষি বিভাগ থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা বিনাধান-১৯ আউশের বীজ বপন করে মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে বাম্পার ফলন পেয়েছেন জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের চাষিরা। একরপ্রতি ৪০ মণ বিনা ধানের ফলন হয়েছে। তবে বর্তমান বাজারে ধানের সঠিক মূল্য না পেয়ে চরম হতাশা বিরাজ করছে কৃষকদের মধ্যে।

সফল চাষি আবদুল জলিল বলেন, আমাদের বিনাধান-১৯ (আউশ) এর বীজ কৃষি বিভাগ থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। ওই বীজ বপনের মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে আমরা জমিতে বাম্পার ফলন পেয়েছি। কিন্তু ফলন উৎপাদন করতে গিয়ে আমাদের যে পরিমাণ খরচ হয়েছে সে হিসেবে আমরা বাজারে ধান বিক্রি করতে পারছি না। বর্তমানে ধানের বাজারে ৪০০ টাকা দরে প্রতি মণ ধান বিক্রি করতে হয়।

তিনি বলেন, তাদের প্রতি একরে গড়ে ৪০ মণ করে ধান হয়েছে। তিনি ৭ একর জমিতে বিনাধান-১৯ (আউশ) চাষ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

কৃষক জাকির হোসেন মোল্লা বলেন, আগে তার ২৮ শতক জমিতে ১০ থেকে ১২ মণ আউশ ধান পাওয়া যেত। তাছাড়া বাকি সময় জমি অনাবাদি পরে থাকত। এখন বিনাধান-১৯ চাষ করার পাশাপাশি তিনি আউশ, মসুর ও আমন ফসল ফলাতে পারছেন। ফলে এখন আর তার জমি অনাবাদি পড়ে থাকে না।

সিলেট প্রতিনিধি জানান, বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও এবার সিলেট জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আউশ ধান উৎপাদন হয়েছে। প্রণোদনার সুফল হিসেবে এমন সাফল্য এসেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জেলার ১২ উপজেলায় রোপা আমনের জন্য ১০০টি ভাসমান বীজতলাও তৈরি করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় ৬০ হাজার ৪২৭ হেক্টর জমিতে এবার আউশ ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ধানের উৎপাদন হয়েছে ৭০ হাজার ৩২৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮১৮১ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন বেশি হয়েছে।

কৃষি বিভাগ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড ২২০ হেক্টর, উফশি ৫৭ হাজার ৯৫২ হেক্টর, স্থানীয় জাতের ২ হাজার ২৫৫ হেক্টর। এ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের কথা ছিল।

কিন্তু সরকার ২২ হাজার ৫৮১ কৃষককে আউশ ধানে প্রণোদনা দেওয়ায় উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম হয়েছে। এ অনুযায়ী উফশি ৬৮ হাজার ১০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ২ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। এ হিসেবে সিলেট সদর ৬২৩০ হেক্টর, দক্ষিণ সুরমা ৬৪২৫ হেক্টর, গোয়াইনঘাট ৬৮৭০ হেক্টর, বালাগঞ্জ ২৫৪৯ হেক্টর, ওসমানীনগর ৩২৬১ হেক্টর, কোম্পানীগঞ্জ ৩৫২০ হেক্টর, বিশ^নাথ ৭৬১৫ হেক্টর, ফেঞ্চুগঞ্জ ৪২৫০ হেক্টর, গোলাপগঞ্জ ৪৭৫৫ হেক্টর, জৈন্তাপুর ৭৮৩০ হেক্টর, কানাইঘাট ৬২৫০ হেক্টর, জকিগঞ্জ ৬৪২৫ হেক্টর, বিয়ানীবাজার ৪৩২০ হেক্টর এবং মেট্রোপলিটন ২৫ হেক্টর ধান চাষ হয়। সব মিলিয়ে জেলায় উফশি ৬৮ হাজার ১০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ২ হাজার ৩১৫ হেক্টর ধান চাষ হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সিলেটের উপপরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, আমরা কৃষকদের মধ্যে ভালো জাতের বীজ এবং সার সরবরাহ করেছি। ৪৪ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্যায় ক্ষতির পরও এবার আউশ ফসল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। এজন্য তিনি কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতারও প্রশংসা করেন।

শেরপুর প্রতিনিধি জানান, শেরপুরে আউশ আবাদে আগ্রহী হয়ে ওঠছেন কৃষকরা। সরকারের কৃষি প্রণোদনা এবং আউশ মৌসুমে উন্নত জাতের ধানবীজ কৃষকদের আউশ আবাদে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। বৃষ্টির পানিতেই আউশ আবাদ করা যায় বলে সেচ খরচ লাগে না। বোরো এবং আমনের মাঝামাঝি সময়ে আউশ আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। তারা একে ‘বোনাস ফসল’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, এখন ধান উৎপাদনে খরচ কমাতে সেচনির্ভর ধানের আবাদ কমাতে হবে। তাছাড়া লাইন ও লোগো পদ্ধতিতে ধান রোপণ এবং খেতের বিভিন্ন স্থানে ডালপালা পুঁতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমাতে পাখি বসার জন্য পার্চিং করে কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে। এজন্য তারা কৃষকদের বৃষ্টিনির্ভর আউশ ধানের আবাদ বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব মতে, শেরপুর সদর উপজেলায় এ বছর ১ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০০ হেক্টর বেশি আবাদ হয়েছে।

 

"