‘ডিসকো পোলারা’ ভয়ংকর

ভিনদেশি সংস্কৃতিকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

ওদের বয়স ১৩-১৯। একেবারে টিনেজ। পরনে থাকে টি-শার্ট ও জিন্স প্যান্ট। চোখে রঙিন সানগ্লাস। বৈচিত্র্যময় চুুলের ছাঁট। দেহের শিরায় শিরায় আহত যৌবনের রক্ত-আগুন। পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে জমিয়ে আড্ডা চলে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত। হাতে ব্রেসলেট। স্টাইল করে সিগারেটে আগুন ধরিয়ে হিরোদের মতো দেয় টান। উচ্চস্বরে গায় হিন্দি কিংবা ইংরেজি গান। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো বয়স বিবেচনা নেই তাদের। রাত বাড়লেই রাজধানীর অভিজাত এলাকায় শুরু হয়ে যায় এমন ‘ডিসকো পোলাদের’ মোটর ও কাররেসিং। এলাকাভেদে এদের রয়েছে পৃথক গ্রুপ। একেকটি গ্রুপকে ‘গ্যাং’ বলা হয়। বিভিন্ন নামে চলে কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম।

এমনই হাজার কিশোর এখন পুরো রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যাদের অনেকেই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় দ-বিধি অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না পুলিশ। আটক করা হলেও পাঠানো হয় শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে। অথচ ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

রাজধানীতে কিশোর-তরুণদের মধ্যে দলবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘গ্যাং কালচার’। এসব ক্ষেত্রে গড়ে উঠছে বিভিন্ন নামে খোলা ফেসবুক গ্রুপকে কেন্দ্র করে। স্মার্টফোনের অ্যাপ ব্যবহার করে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে, সংগঠিত হচ্ছে। এরা মাদকের নেশা, ছিনতাই, রাহাজানির মতো অপরাধে যেমন জড়াচ্ছে, বিভিন্ন দলের কোন্দলে হত্যাকা-ের মতো ভয়ংকর সব ঘটনাও ঘটাচ্ছে।

বরগুনায় ‘বন্ড জিরো জিরো সেভেন’ নামের এক ফেসবুক গ্রুপ ঘিরে সংঘবদ্ধ হওয়া একদল কিশোর-তরুণের হাতে রিফাত শরীফ হত্যাকা-ের পর ঢাকাতেও বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় উঠতি বয়সি অপরাধীদের গ্রেফতারে সক্রিয় হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত জুলাই মাসে ঢাকার উত্তরায় অভিযান চালিয়ে ১৪ কিশোর-তরুণকে গ্রেফতার করা হয়। তারা ‘এফএইচবি গ্যাংস্টার’ নামের এক ফেসবুক গ্রুপের সদস্য। এরপর ২৫ আগস্ট রায়েরবাজার এলাকা থেকে ‘স্টার বন্ড’ ও ‘মোল্লা রাব্বি’ নামে দুই গ্রুপের ১৭ কিশোরকে ধারালো অস্ত্র, মাদকসহ আটক করে সংশোধনাগারে পাঠান র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মুগদা-মা-া এলাকা থেকে ২৩ তরুণকে আটক করে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক তিনজনকে পাঠানো হয় সংশোধনাগারে। তারা কিশোর-তরুণদের গ্যাং ‘ডেভিলস কিং’, ‘চান-যাদু’ ও ‘আগুন’ গ্রুপের সদস্য।

সর্বশেষ গত শুক্রবার হাতিরঝিল, মধুবাগ, মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় অভিযান চালিয়ে কটূক্তি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করাসহ বিভিন্নভাবে পথচারীদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে ১১০ কিশোর-তরুণকে আটক করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। যদিও যাচাই-বাছাই শেষে সাতজন ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশিদ জানিয়েছেন, সাতজনের বিরুদ্ধে আগের কিছু অভিযোগ রয়েছে পুলিশের কাছে। এদের অধিকাংশই বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তারা বিভিন্ন জায়গায় জটলা করে ইভটিজিং করে, পথচারীদের নানাভাবে কটূক্তি করে। বাকিদের বিষয়ে তেমন অভিযোগ নেই। তাই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে গতকাল পুরান ঢাকায় তাজিয়া মিছিলের নিরাপত্তা আয়োজন পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া কিশোর গ্যাং সম্পর্কে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কিশোর গ্যাং বলি আর বড় গ্যাং বলি, ঢাকায় গ্যাং বলে কোনো শব্দ থাকবে না। সবাইকে নিশ্চিহ্ন করা হবে।

দেশে কিশোর অপরাধ আগেও ছিল। তবে বর্তমানের মতো এমন হিংস্রতা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। গত অর্ধযুগ ধরে কিশোর অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। এর ধরন পালটে গেছে। তাদের অপরাধগুলো ক্রমেই হিংস্র নৃশংস বিভীষিকাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খুন, ধর্ষণ ও ধর্ষণ করার পর হত্যা করার মতো হিংস্র ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। সংঘবদ্ধভাবে প্রকাশ্য দিনের আলোয় নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে।

দেশে বিরাজমান এখনকার কিশোর গ্রুপ কিশোর গ্যাং ও দ্রুতলয়ে বেড়ে যাওয়া কিশোর অপরাধ সম্পর্কে কেউ কেউ বলছেন, এতে ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রসারের প্রভাব রয়েছে। কেউ বলছেন, পারিবারিক বন্ধন শিথিল, মা-বাবার সঙ্গে কিশোর সন্তানদের দূরত্ব তৈরি এবং খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে শিশুদের মধ্যে নেতিবাচক প্রবণতা বাড়ছে, যা কিশোরদের ভ্রান্তপথে যাওয়ার একটি কারণ। অনেকের মতে, ক্ষমতার দাপটে সন্ত্রাসী ও খুনিরা বিচারব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমাজে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে। কিশোররা এসব দেখে ধরে নিচ্ছে সন্ত্রাস করে পার পেয়ে যাওয়া তাদের পক্ষেও সম্ভব। তাই তারাও হয়ে উঠছে বেপরোয়া।

কিশোর গ্যাং কালচারের যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে। মূলত মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, পার্টি করা, হর্ন বাজিয়ে প্রচ- গতিতে মোটর বা কাররেসিং করা, খেলার মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা, দেয়ালে চিকা মেরে নিজেদের পাওয়ার বা অবস্থান জানান দেওয়া, এমনকি মাদক গ্রহণ প্রভৃতি কর্মকা- ঘিরে গড়ে উঠেছে এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপ। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে এখন ফেসবুকেও এদের পেজ রয়েছে। ওই সব পেজে গ্রুপের সদস্যরা সারা দিন অশ্লীল ভাষায় তথ্য আদান-প্রদান করে। একপর্যায়ে কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে হত্যার মতো অপরাধে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক বলেন, সমাজে নানা অসংগতি রয়েছে। নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিশোররা। তাদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে। কিশোর বয়সে হিরোইজম ভাব থাকে। এই হিরোইজমকে সঠিক পথের অনুসারী করে তুলতে হবে। আবার কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। এর দায় আমাদের সবার। অনেক ক্ষেত্রে ভিনদেশি সংস্কৃতি ইচ্ছামতো তাদের আয়ত্তে চলে যাওয়ায় কিশোরদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, গ্যাংস্টার গ্রুপের সদস্যরা ছোটখাটো অপরাধ করতে করতে বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাই এদের সংশোধন করতে সর্বপ্রথম অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর রাখলে তাদের অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

এদিকে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায়ও রয়েছে ২০-২৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ। চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে অন্তত ছয়টি গ্যাং। মাদক, ডিজে পার্টি ও চুরি-ছিনতাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে এই গ্যাংয়ের কিশোররা। এর জের ধরেই গত বছরের জানুয়ারিতে জামাল খান এলাকায় হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান ইসফারকে। একইভাবে ওই বছরের জানুয়ারিতে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে খুলনা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শেখ ফাওমিদ তানভীর রাজিমকে। খুলনা শহরে কিশোরদের অন্তত সাতটি গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

 

"