‘জনপ্রিয়তা পেতে’ ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর স্টেরয়েড!

সাময়িক স্বস্তি মিললেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

কবজিতে তীব্র ব্যথা নিয়ে ফিজিক্যাল মেডিসিন চিকিৎসকের কাছে হাজির হন সালমা খাতুন (ছদ্মনাম)। চিকিৎসক কোনো পরীক্ষা না করে খুবই কমন অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করে স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। রোগীর ডায়বেটিস বা উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা আছে কি-না সেটিও জানতে চাননি। স্টেরয়েড ইনজেকশন নিয়ে পরের দিনই সেরে উঠলেন সালমা। কিন্তু পাঁচ মাস পর দ্বিগুণ হয়ে ব্যথা ফিরে এলো কবজির আগের জায়গাতেই। চিকিৎসকরাই বলছেন, দ্রুত ব্যথা কমিয়ে দিতে জুড়ি নেই স্টেরয়েডের। আর সেই ম্যাজিক দেখাতে রোগীদের কাছে ‘জনপ্রিয়তা পেতে’ চিকিৎসকদের অনেকেই কোনো তোয়াক্কা না করেই এই ওষুধ লিখে দিচ্ছেন। স্টেরয়েড দেওয়ার পরে যখন সেই ব্যথা পুনরায় ফিরে আসে, তখন সারতে অনেক বেশি সময় লাগে।

দেড় বছরের শিশুকে দুই দিনের জ্বরের পর নিয়ে যাওয়া হলো রাজশাহীর রয়েল হাসপাতালে। শিশু চিকিৎসক ডেঙ্গু টেস্ট দেওয়ার পাশাপাশি তাকে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে বাসায় পাঠালেন। পারিবারিক একজন বন্ধু চিকিৎসক পরামর্শপত্র দেখে সেই ওষুধগুলো না খাওয়ানো ভালো এবং হুটহাট স্টেরয়েড শিশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে কমিয়ে দেবে সে বিষয়ে জানালেন। অভিভাবকদের প্রশ্ন, চিকিৎসকরা কী ওষুধ দিচ্ছেন সেটি পরীক্ষা করার সুযোগ তো টেকনিক্যাল কারণে রোগীদের নেই এ ক্ষেত্রে কাকে বিশ্বাস করবেন?

ডিকোয়ার ভেইন সিনড্রোমের (কবজির কাছে তীব্র ব্যথা) ফলে এই স্টেরয়েড দিলে সেটি শরীর ভেদে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যথা কমিয়ে থাকে। পরে স্টেরয়েডের প্রভাব কেটে গেলে আবারও ফিরে আসে সেই ব্যথা। এমনকি পুরুষ ও যৌনকর্মী নারীরা শক্তি বাড়াতে অজ্ঞতাবশত ক্ষতিকর স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। স্টেরয়েড ব্যবহার করলে সাময়িকভাবে শক্তি বাড়লেও শরীরের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বলে মত দেন ফিজিওথেরাপিস্টরা। তারা বলছেন, থেরাপি দিয়ে যে ব্যথা সারানো যায়, সেটি স্টেরয়েড দিয়ে থামালে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে প্রশ্নে প্রবীণ হিতৈষী হাসপাতালের ইনস্টিটিউট অব জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের চিকিৎসক মহসিন কবীর বলেন, ‘পেশির কমনীয়তা হ্রাস পায় এবং পেশির স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়। সাধারণত বয়স্ক রোগীদের ব্যথানাশক হিসেবে এটি দেওয়া হয়ে থাকে। কম বয়সে স্টেরয়েড নেওয়া নিরুৎসাহিত করি। কিন্তু এটি ব্যবহারে রোগী অনেক দ্রুত আরাম পায় বলে কখনো কখনো দ্বিতীয়বার একই রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই আবার ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহার করলে দেখা দেয় নানা ধরনের সমস্যা।’

মহসিন কবীর বলেন, ‘স্টেরয়েডের সঙ্গে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে ইনজেকশন দেওয়ার কারণে ওখানে বোধ থাকে না। এটি কারো শরীরে বছর খানেক পর্যন্ত কাজ করে, কিন্তু স্টেরয়েডের প্রভাব শেষ হলে ব্যথাটা দ্বিগুণ হয় এবং সেটা সারতে আরো বেশি সময় লাগে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই কেবল চোখের দেখায় দেখে স্টেরয়েড দেওয়া যাবে না। স্টেরয়েড দেওয়ার স্পেসিফিক নিয়ম রয়েছে। এর জন্য সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে এবং যাদের জন্য প্রযোজ্য কেবল তাদেরই দিতে হবে।’ তারও অভিযোগ, ‘দ্রুত ব্যথা সারিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত এ রকম সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে কিছু চিকিৎসক না ভেবেই এর প্রয়োগ করে থাকেন।’

স্টেরয়েডের নানা ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে মন্তব্য করে এই চিকিৎসক বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় স্টেরয়েড ডায়াবেটিস, আলসার, উচ্চ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, সাইক্রিয়াট্রিক সমস্যা তৈরি করে, হাড় ক্ষয় করে মাংস পেশি শুকিয়ে যায়, যাকে বলা হয় পুশিং সিনড্রোম। এর আদর্শ নিয়ম হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যদি মনে করেন পরীক্ষার ভিত্তিতে দিতে হবে, তাহলেই কেবল তারা দেবেন। সবচেয়ে বড় কথা, পরীক্ষা ছাড়া স্টেরয়েড দেওয়া যাবে না।’

"