স্থানীয়রাই এখন নাজেহাল

রোহিঙ্গা-আশ্রয়ের ২ বছর আজ

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার)

মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পূর্তি আজ রোববার। দিনটিকে ব্যাপক আকারে ৩০টি ক্যাম্পে পালন করতে রোহিঙ্গারা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অপরদিকে, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থী কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। রোহিঙ্গাদের চাপে এখন এখানকার স্থানীয়রাই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

গত বছরও রোহিঙ্গারা ক্যাম্পগুলোতে তাদের পলায়নের প্রথম বার্ষিকী উদ্যাপন করেছিল। এবারের বর্ষপূর্তি উদ্যাপনের আগে তারা সমন্বিতভাবে গত বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা বানচাল করতে সক্ষম হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গত ১৫ দিন ধরে রোহিঙ্গা নেতারা কাজ করেছেন। তারা সব ক্যাম্পে ২৫ আগস্ট ব্যাপকভাবে পালন করতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ত করতে সভা-সমাবেশ করেছেন। রোহিঙ্গাদের দেশি-বিদেশি কয়েকটি সংগঠনের নির্দেশনা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা নেতা এবং মাঝিরা দিবসটি পালনে অধিক তৎপর হয়েছে। এবার সব ধরনের নারী, শিশু ও পুরুষদের সম্মিলিতভাবে প্রতিটি ক্যাম্পে মিছিল, মিটিং ও বিক্ষোভ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে রোহিঙ্গারা জানায়। বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের নানা সংগঠনের নেতারা ক্যাম্পগুলোতে তাদের অনুসারী নেতারা ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি নিলেও কেউ কেউ কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাচ্ছে না বলে জানা যায়।

গত বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নির্ধারিত দিনে নানা উসকানি ও প্ররোচনায় তা বানচাল হওয়ায় এবার রোহিঙ্গারা অধিক উৎসাহে ২৫ আগস্ট পালন করছে বলে জানা যায়। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বা এআরএসপিএইচ, ভয়েস অব রোহিঙ্গা যৌথভাবে তাদের গৃহীত কর্মসূচি পালনের অনুমতি পেয়েছে বলে জানা গেছে। এ দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পগুলোর বিভিন্ন ব্লক মাঝিকে প্রয়োজনীয় ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড সরবরাহ করা হয়েছে। উখিয়ার ২০টি ক্যাম্প থেকে একই সময়ে ২৫ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ ক্যাম্পের মাঠে সমবেত হওয়ার কথা। এ দুটি রোহিঙ্গা সংগঠন তাদের দেশি-বিদেশি নেতাদের সমন্বয়ে কর্মসূচির যাবতীয় সরঞ্জামাদির খরচ মেটাচ্ছে বলে জানা যায়। প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে সাদা কাপড় পরে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের নির্দেশ রয়েছে। বিশাল আয়োজন, ব্যানার, মালামাল, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ইত্যাদির জোগানদাতা ও খরচ বহনকারীরা বরাবরই আড়ালে থেকে যাচ্ছে বলে অনেকের অভিমত।

উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল মনসুর বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ২৫ আগস্ট পালন উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পের ইনচার্জরা দেখভাল করবেন।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এখনো এ ব্যাপারে সরকারের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ৯৪ হাজার। এর মধ্যে রয়েছেÑ উখিয়ায় ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ এবং টেকনাফে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৪০০। সেখানে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সহিংস ঘটনার পর পালিয়ে আসা সাড়ে ৭ লাখসহ মোট ১১ লাখ ১৮ হাজার ৪১৭ জন রোহিঙ্গা বাস করছে। এসব রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস করে বসতি গড়ে তুলেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর সঙ্গেই রয়েছে স্থানীয়দের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বসতি ও চাষযোগ্য জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এ কারণে অনেকের ভিটেবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও চাষাবাদের জমি অঘোষিতভাবে দখল করে নিয়েছে রোহিঙ্গারা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে স্থানীয়রা। একইভাবে শ্রমবাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এখানে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলোÑ

নিত্যপণ্যের বাজার গরম : উখিয়া ও টেকনাফের বাজারগুলোতে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। রোহিঙ্গাদের কারণেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। উখিয়ার কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ত্রাণ হিসেবে চাল পাচ্ছে। এ কারণে চালের বাজার এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। তবে এখানে সবজির দাম আকাশচুম্বী। মাছ তো সময়মতো পাওয়াই যাচ্ছে না।’ একদিকে রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ বিচরণ, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজার গরম হওয়ায় বিপাকে পড়েছে স্থানীয়রা।

বনাঞ্চল ধ্বংস : রোহিঙ্গাদের বসতির কারণে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ নিয়ন্ত্রণাধীন উখিয়া ও টেকনাফে ৬ হাজার ১৬৩ একর বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৭ একর সৃজিত বন (প্রধানত সামাজিক বনায়ন) ও ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন রয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮৮০ রোহিঙ্গা বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের জন্য ২ লাখ ১২ হাজার ৬০৭টি গোসলখানা, ত্রাণ সংরক্ষণের জন্য ২০টি অস্থায়ী গুদাম, ১৩ কিলোমিটার বিদ্যুতের লাইন, ৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ এবং ২০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক একটি অবকাঠামো তৈরি করবে। এজন্য ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার বন ধ্বংস হয়ে গেছে।

শ্রমবাজারে মন্দা : রোহিঙ্গাদের আগমনে স্থানীয় কিছু শিক্ষিত যুবকের ক্যাম্পে কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানে ১০৫টি এনজিওতে স্থানীয় ২ হাজার শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে পুরো কক্সবাজার জেলায় শ্রমবাজারে দেখা দিয়েছে মন্দা। রোহিঙ্গারা দিনমজুরসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় শ্রমিকরা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘উখিয়ায় বাড়তি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। তবে চাল, ডাল ও তেলসহ কিছু পণ্যের দাম কম। অন্যদিকে, জেলার শ্রমবাজারে মন্দাভাব দেখা দিলেও বেশকিছু শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।’

 

"