রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহে ফের আটকে গেল প্রত্যাবাসন

প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

কক্সবাজার ও উখিয়া প্রতিনিধি

সব ধরনের প্রস্তুতি ও উদ্যোগ সম্পন্ন হওয়ার পরও রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণে শেষ মুহূর্তে এসে বহুলপ্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত ঘোষণা করেন। সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে নয়াপাড়া-২৬নং ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে তিনি গতকাল বৃহস্পতিবারের প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিতের ঘোষণা দেন। এর আগে যে কতবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, প্রতিবারই রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহে ভেস্তে গেছে। সে সময়ও তারা নানা রকম শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিলÑ নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বাড়িঘর-জমি ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা। মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৯০ জনের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়। তারা প্রত্যেকেই বলেছেন, মিয়ানমারে ফেরত যাবেন না। এখন পর্যন্ত একজনও রাজি হয়নি। ফলে কাউকে নেওয়া যাচ্ছে না। তবে সাক্ষাৎকার চলমান থাকবে।’ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ কি-না জানতে চাইলে আবুল কালাম বলেন, ‘এটা ব্যর্থ বলতে পারেন না। সব পরিবারের সাক্ষাৎকার চলবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে এটা। আমাদের বাস-ট্রাকও রেডি থাকবে। কেউ যেতে চাইলে পাঠানো হবে।’ তিনি আরো জানান, ‘মিয়ানমার সরকারের দেওয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী ১ হাজার ৩৭টি পরিবারের মোট ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেওয়ার প্রথম তালিকাটি দেওয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি। পর্যায়ক্রমে অন্যদের এই প্রক্রিয়ায় আনা হবে। কারণ এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’

মিয়ানমারে ফিরতে যেসব শর্ত দিয়েছেন রোহিঙ্গারা সেসব শর্তের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এগুলো মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাদের ব্যাপার। আমরা শুধু সীমান্ত পার করে দেব।’ এ খবরে স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেলেও সেখানকার রোহিঙ্গা ও এনজিও কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বস্তির আভাস লক্ষ্য করা গেছে। মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও সেখানে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা না হওয়া পর্যন্ত সেখানে যাবেন না বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা। এদিকে, বাংলাদেশের ঘুমধুম সীমান্তে বহুলপ্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উভয় দেশের কর্মকর্তাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। উখিয়ার বালুখালী থেকে ঘুমধুম সীমান্তের মৈত্রী সেতু পর্যন্ত দুই কিলোমিটার নবনির্মিত মৈত্রী সড়কজুড়ে সীমান্তরক্ষী বিজিবি সদস্যদের সকাল থেকে কড়া নজরদারিতে থাকতে দেখা গেছে। সকাল বেলা ১১টার দিকে বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান ঘুমধুম সীমান্তে আসেন। কক্সবাজার-৩৪ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল আলী হায়দার আলী আজাদ সকাল থেকে ঘুমধুম বিজিবি বিওপিতে অবস্থান করছিলেন।

অপরদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অভ্যর্থনা জানাতে সে দেশের কেন্দ্রীয় ও রাখাইন প্রাদেশিক মন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তাদের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা, রেড ক্রসসহ সংশ্লিষ্টরাও অবস্থান করছিলেন।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের ঢেকিবনিয়া জিরো পয়েন্ট থেকে তুমব্রু লেটওয়ে ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ বলেন প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। রোহিঙ্গা ফেরত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে চীনের দুজন, মিয়ানমার দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরের অবস্থান করেন। একই সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের অপর তিন কর্মকর্তাও কক্সবাজার অবস্থান করেন। এছাড়া মিয়ানমারের ওপারে দেশটির উচ্চপর্যায়ের দুটি দল সীমান্তে অবস্থান করেছেন বলে কক্সবাজার শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কর্মরত এনজিওগুলোর ইন্ধনে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু রোহিঙ্গা বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া অন্তত সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি।

 

"