অভিযোগের মধ্যে শুরু চামড়া কেনা

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকার ও ট্যানারি মালিকরা মিলে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছেন অনেক আগেই। এরপরও নগদ টাকার অভাবে তা সংগ্রহ করতে পারেনি অনেকেই। আবার অনেকে কেনার পরও লবণের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তা সংরক্ষণে ব্যর্থ হন। ফলে পচে নষ্ট হয়ে যায় হাজারো কাঁচা চামড়া। তবে এসব অভাব-অভিযোগের মধ্যেই গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে চামড়া কেনা। এদিকে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলছেন, কাঁচা চামড়া কেনায় বাজারে সিন্ডিকেট হয়নি। প্রতি বছরই ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেটের কথা বলেন, এটা সঠিক নয়। তাদের কাছে আমাদের পাওনা (বকেয়া) টাকা যখন আমরা পাই না, তখনই সমস্যা তৈরি হয়।

সব ব্যবসায়ীর কাছে টাকা থাকলে বাজারে প্রতিযোগিতা থাকত, ফলে চামড়ার দামও বাড়ত।

ট্যানারি মালিকরা বলেন, আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে গত দুই দিন চামড়া কেনা হয়নি। তবে আজ থেকে সারা দেশে পুরোদমে চামড়া কেনা চলছে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দামেই চামড়া কেনা হচ্ছে বলেই দাবি করেন ট্যানারি মালিকরা।

অন্যদিকে নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা শুরু হলেও আবারও পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় নগদ মূল্যের পাশাপাশি বাকিতেও চামড়া বিক্রি করে দিচ্ছেন আড়তদাররা। এসব বকেয়া কবে নাগাদ পাওয়া যাবে, সেটি তারা নিজেরাও জানেন না।

পোস্তা এলাকার ব্যবসায়ীরা বলেন, এ ব্যবসা আমাদের বাবা-দাদার রেখে যাওয়া ব্যবসা। আমরা বহু বছর ধরে এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু গত দুই থেকে তিন বছর ধরে ট্যানারি মালিকরা পুরোনো বকেয়া পরিশোধ করছেন না। অথচ তারা ঠিকই সরকার ও ব্যাংকের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। তাদের কাছে বকেয়া থাকায় অনেকেই এবার চামড়া কিনতে পারেননি, অনেকে আবার সংগ্রহ করার পরও তা সংরক্ষণে ব্যর্থ হন। হঠাৎ লবণের মূল্য বেড়ে দুই গুণ হওয়ায় চামড়াতে পর্যাপ্ত লবণ দেওয়া যায়নি। ফলে নষ্ট হয়ে গেছে হাজারো চামড়া।

হাজি দিল জাহান আড়তের মালিক সহিদুল ইসলাম বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে আমার ৪ কোটি টাকা বকেয়া আছে। এরপরও ৯০০ চামড়া কিনেছি খুব কষ্টে। কিন্তু চামড়া কেনা হলেও লবণের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চামড়াতে পর্যাপ্ত লবণ দিতে পারিনি। ফলে ৯০০ চামড়া মধ্যে মাত্র ১০০ চামড়া ভালো ছিল, বাকি সব পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

সাজ্জাদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক সাজ্জাদ বলেন, আমাদের অনেক টাকা বকেয়া আছে। এরপরও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে চামড়া কিনেছি। আজ থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। কিছু নগদ আর কিছু বাকিতে বিক্রি করেছি। জানিনা এ বকেয়া কবে নাগাদ পাব। তবে ট্যানারি মালিকরা সময়মতো টাকা পরিশোধ করলে আমরা ভালো দামে চামড়া সংগ্রহ করতে পারি। এতে কারোরই লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এবারের ঈদুল আজহায় সরকার ও ট্যানারি মালিকরা মিলে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। গত বছরের দাম অনুযায়ীই এ বছরের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা ও ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা হারে নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালেও একই দাম ছিল।

এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা ও বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকায় সংগ্রহ করতে বলা হয় ব্যবসায়ীদের। তবে ট্যানারি মালিকদের বকেয়ার কারণে নির্ধারিত মূল্যোর চেয়ে কম দামেই চামড়া সংগ্রহ করতে হয় আড়তদারদের।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে গত দুই দিন চামড়া কেনা হয়নি। আজ থেকে কেনা শুরু হয়েছে, যা আগামী তিন মাস পর্যন্ত চলবে। আর বকেয়ার বিষয়টি বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) মাধ্যমে সমাধান হয়ে যাবে। পুরোনো বকেয়া কীভাবে দেওয়া য়ায়, সেটি ওই দিনই ঠিক করা হবে। তবে সব জটিলতা শেষে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দামেই আমাদের চামড়া কেনা শুরু হয়েছে।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমরা বলেছি, আমাদের কাছে টাকা নেই। অনেকেই ধারদেনা করে চামড়া কিনেছেন, অনেকেই কিনতে পারেননি। তবে ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে পোস্তায় চামড়া এলে অবস্থা আরো ভয়াবহ হতো। আমরা হয়তো সেগুলো কিনতে পারতাম না। ট্যানারি মালিকরা বলছেন সিন্ডিকেট, তাহলে বকেয়া দিয়ে দেখেন কত দামে চামড়া কিনি। টাকা থাকলে প্রতিযোগিতা থাকে। এমন অনেক ব্যবসায়ী আছেন যারা এ পেশা ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন। তাদের কাছে ১৯৯০ সাল থেকে মোট ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া আছে। ২০১৫ সালের দিকে কিছুটা বকেয়া কমেছিল, তবে গত দুই বছরে আবার বেড়ে গেছে। আমাদের টাকা কী কাগজ? আমাদের টাকা নিয়ে ঘুরবেন এটা হতে পারে না, এর শেষ দেখতে চাই, বলেন দেলোয়ার হোসেন।

 

"