বিবিসির প্রতিবেদন

গণমাধ্যম থেকে মুজিবের নাম যেভাবে মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল

প্রকাশ | ১৭ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের কোনো প্রচারমাধ্যম এমনকি চলচ্চিত্রেও তার নাম বা ছবি প্রকাশ হতে দেখা যায়নি। তৎকালীন সরকারি প্রচারমাধ্যমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ মুজিবকে হত্যার পর এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার

গঠনের আগ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারা নানাভাবে ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।

শেখ মুজিবকে হত্যার পরপর ভোরবেলায় শাহবাগের বাংলাদেশ বেতারের ব্রডকাস্ট শাখা থেকে হত্যাকা-, সেই সঙ্গে সামরিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিল। ঘটনার দিন বাংলাদেশ বেতারের শাহবাগ ব্রডকাস্ট শাখার শিফট ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছিলেন প্রণব চন্দ্র রায়। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘সেদিনই শেষবারের মতো উচ্চারিত হয় শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি। এরপর থেকে বেতারে কখনো তার নাম শোনা যায়নি।’

তিনি জানান, ভোরবেলা সেনাবাহিনী বেতার অফিসের ভেতরে ট্রান্সমিশন কক্ষে প্রবেশ করে এবং তার মাথার ওপর বন্দুক ঠেকিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার ঘোষণাটি প্রচারের ব্যবস্থা করে দিতে বলে। মেজর ডালিম আমার মাথায় বন্দুক ঠেকায়, তার পুরো শরীর তখন রক্তে ভরা। আমি তখনো জানতাম না কী হয়েছে। এরপর তিনি আমাকে বলেন, শেখ মুজিব অ্যান্ড হিজ গ্যাং অল হ্যাজ বিন কিল্ড। আর্মি হ্যাজ টেকেন পাওয়ার। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে যাই। তখন বুঝলাম যে ক্যু হয়েছে।’

তারপর তিনি সেনাবাহিনীর নির্দেশ মতো রেডিওর ইকুইপমেন্টগুলো খুলে দেন এবং মিরপুরের ট্রান্সমিশন স্টুডিওকে বলেন ঘোষণাটি প্রচার করার জন্য। মেজর শরীফুল হক ডালিম একটা লগ বুকের কাগজে বিবৃতি লেখেন এবং সেটাই প্রচার করেন। যেখানে বলা হয়েছিল, “শেখ মুজিবকে হত্যা করা হইয়াছে এবং খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে। দেশবাসী সবাই শান্ত থাকুন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। পরপর কয়েকবার এ ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তী রেকর্ডিংয়ে শেখ মুজিবকে ‘হত্যা করা হয়েছে’ বলার পরিবর্তে ‘উৎখাত করা হয়েছে’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই মুহূর্তে মেজর শাহরিয়ার রশিদ কড়া নির্দেশনা দেন যেন শেখ মুজিবুর রহমান বা তার দলের নাম, রবীন্দ্রসংগীত, জয় বাংলা সেøাগান কিছুই প্রচার করা না হয়। পরে খন্দকার মুশতাক তার মৌখিক নির্দেশে বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও বাংলাদেশ রাখেন।”

এ সময়ের মধ্যে বিটিভিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারিত হতে শোনেননি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ হামিদ।

তিনি সে সময় বিটিভির প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন, যেখানে শেখ মুজিবের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রামাণ্য চিত্রটি প্রচারের আগ মুহূর্তে নামটি কেটে দেওয়া হয়।

২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরের মতো বিশেষ দিনগুলোয় হাতে গোনা দু-একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গটি জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকম দাঁড় করানো হতো। এমনকি পাঠ্যবইতে শেখ মুজিবের নাম মুছে খ-িত ইতিহাস পড়ানো হতো বলে তিনি জানান।

১৫ আগস্টে পালন করা হতো জাতীয় নাজাত (মুক্তি) দিবস। ওই দিন শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ইতিহাস বা তাকে হত্যার ঘটনা কিছুই প্রচার করা হতো না।

উল্টো বিটিভিতে প্রচারিত বিভিন্ন বক্তৃতা এবং আলোচনায় শেখ মুজিবকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হতো বলে জানা যায়।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় এসেছিল, তারা বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে পুরোপুরি বিপরীত ধারায় নিয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ এলেই তারা ভয় পেত, মানুষ যদি আবার তার ব্যাপারে জানতে শুরু করে। এ জন্য প্রচার প্রোপাগান্ডার মধ্য দিয়ে তার নাম ও আদর্শকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার সার্বিক প্রয়াস চালানো হয়েছিল।’

সে সময় বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন সারাহ বেগম কবরী। তিনি বলেন, তার অভিনীত রক্তাক্ত বাংলা এবং আমার জন্মভূমি চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকটি অংশ এবং সংলাপ সেন্সর বোর্ড থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল শেখ মুজিবের নাম, তার ছবিযুক্ত শট, তার ভাষণের অংশবিশেষ এবং জয় বাংলা সেøাগান। সে সময় যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা ইচ্ছামতো রাজনৈতিকভাবে চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। তাদের কথা ছিল, বঙ্গবন্ধুর নাম বা তার দলের কোনো চিহ্ন যেন কোথাও না থাকে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক ছবিতেও এ বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়েছিল।’

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন আবু সাঈদ।

সে সময় তিনি ‘রেডিও বাংলাদেশ’-এর নাম, মৌখিক নির্দেশে আবার ‘বাংলাদেশ বেতার’ রাখেন। তিনি বলেন, আমি বেতারের ডিজি সাহেবকে ডেকে প্রশ্ন করেছিলাম, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাম বাংলাদেশ বেতার রাখা হয়েছিল। এটা রেডিও পাকিস্তানের আদলে রেডিও বাংলাদেশ কীভাবে হলো? ডিজি সাহেব এ নিয়ে আমাকে লিখিত কোনো নথি বা আদেশনামা দেখাতে পারেননি। শুধু একটি মৌখিক নির্দেশে এই নাম পরিবর্তন হয়েছিল। তারপর আমি পাল্টা নির্দেশ দিলাম, এটাকে আবার বাংলাদেশ বেতার করতে।’

তথ্যমন্ত্রী সাঈদ সে সময় ডিএফপির আর্কাইভ থেকে শেখ মুজিবের সব রেকর্ড কয়েক বছর ধরে পুনরুদ্ধার করেন এবং রেডিও টেলিভিশন ও পত্রিকায় প্রচার করা শুরু করেন।

যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শেখ মুজিবের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাষণ। তিনি বলেন, ‘আমি আর্কাইভে গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের রিলগুলো অযতœ-অবহেলায় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে নষ্ট হচ্ছে। তখন আমি সেগুলো বের করে ওয়াশ করার জন্য ভারতের পুনেতে পাঠাই। কারণ বাংলাদেশে ওই প্রযুক্তি ছিল না। এখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত ভিজুয়াল দেখেন, বেশির ভাগ সে সময়ের উদ্ধার করা।’

 

"