ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮ হাজার ছাড়াল

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট রোগীর সংখ্যা ৪৮ হাজার ২২০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে চলতি মাসে সর্বাধিক ২৯ হাজার ৮১৯ জন আক্রান্ত হন। তবে আশার কথা হলোÑ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪০ হাজার ৬৭০ জন। বর্তমানে সারা দেশে ভর্তি রয়েছেন ৭ হাজার ৫৭০ জন। গতকাল সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯২৯ জন। তাদের মধ্যে ঢাকা শহরে সর্বমোট (সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে) ভর্তি হয়েছেন ৮১১ জন। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১১৮ জন। এদিকে গতকাল ঢাকা ও মাগুরায় স্বাস্থ্য সহকারী তিনজন মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪০ জনের মৃত্যু হলো। এদিকে গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ার শঙ্কা বেড়েছে। সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান ঘুরে চোখে পড়েছে এডিসের লার্ভা। ধ্বংসে নেই তৎপরতা। দফায় দফায় বৃষ্টিতে জমছে পানি। সেই সঙ্গে বাড়ছে শঙ্কা।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এডিস নিধনে কোনো তৎপরতাই নেই। মিরপুর-১২ নম্বর বিআরটিসি বাসডিপো যেন এডিস মশার চারণভূমি। চলতি মাসেই দুই দফা অভিযান চালিয়েছে সিটি করপোরেশন। শতাধিক পরিত্যক্ত টায়ার অপসারণের পরও চারদিকে ছড়িয়ে আছে এডিসের আবাসস্থল। বছরের পর বছর এসব বাসের মধ্যে জমে থাকা পানিতে কিলবিল করছে লার্ভা। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থা। মিরপুর-১০ নম্বরে সুইমিং কমপ্লেক্সেও মিললো লার্ভা। সবারই কেবল দায় এড়ানোর চেষ্টা।

সিটি করপোরেশনের অভিযোগ, ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রকল্পের কাছ থেকে মিলছে না সহযোগিতা। সিটি করপোরেশন বলছে, অনেক সরকারি স্থাপনা আছে যেগুলো নির্মাণাধীন। সেখানে আমরা গিয়েছি কিন্তু সেভাবে সহযোগিতা পাইনি।

রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ঢাকা মেডিকেলে ১৩১ জন, মিটফোর্ডে ৬৭, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২৫, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৬৬, বিএসএমএমইউতে ২১, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ১৩, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০৯, বিজিবি হাসপাতাল পিলখানা ঢাকায় ৫, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ২৩, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৬৫ ও বেসরকারি অন্যান্য হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২৮৬ জন ভর্তি হয়েছেন।

বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে মোট আক্রান্ত ১ হাজার ১১৮ জনের মধ্যে ঢাকা শহর ব্যতীত ঢাকা বিভাগে ২৯৫ জন, চট্টগ্রামে ২০৯, খুলনায় ১৫১, রংপুরে ৮১, রাজশাহীতে ১৩০, বরিশালে ১৭১, সিলেটে ২৫ ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকা : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মৌসুমী আক্তার (২৫) নামে এক পোশাক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি পিরোজপুরের মো. মামুনের স্ত্রী। এ নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে এ পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যু হলো।

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাচ্চু মিয়া জানান, হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৌসুমী মারা যান।

তিনি আরো জানান, কয়েকদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত মৌসুমী গত বুধবার মহাখালীর টিবি হাসপাতালে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সেখান থেকে তাকে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার আরো অবনতি হলে ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

মৌসুমীর স্বামী মো. মামুন বলেন, তাদের বাসা তালতলা মোল্লাপাড়ায়। মৌসুমী ৬০ ফুট এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। আর মামুন কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার সকালে মৌসুমীর জ্বর এলে শ্যামলীর একটি হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর চিকিৎসকরা মৌসুমীকে দ্রুত ঢামেক হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টায় মৌসুমীকে ঢামেক হাসাপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করার পর দুই ঘণ্টার মাথায় তার মৃত্যু হয়। তাদের কোনো সন্তান নেই জানিয়ে মামুন বলেন, মৌসুমীর লাশ পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় তাদের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে।

এদিকে, তপন কুমার মন্ডল (৩৮) নামে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়া স্বাস্থ্য সহকারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। গতকাল বিকাল ৩টার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে আইসিউতে তার মৃত্যু হয়।

জানা যায়, গত ১১ আগস্ট ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে আসেন। পরে তাকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। সেখানে রক্তের প্লাটিলেট ৩০ হাজারে নেমে আসে।

এরপর ১২ আগস্ট রাতে দ্রুত ঢাকাস্থ বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে আইসিউতে নেওয়া হয়। ব্রেন হেমারেজসহ বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হলে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং বিকালে তিনি মারা যান।

এছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে ঢাকা শিশু হাসপাতালে। তার নাম রাজ চৌধুরী। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল দুপুরে তার মৃত্যু হয়। রাজের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর ১০ মাস। সে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. নির্মল কান্তি চৌধুরীর ছেলে।

শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শাহীন শরীফ জানান, বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রাজকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসে তার পরিবার। ভর্তির পর সরাসরি তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ঢাকা শিশু হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুুল হাকিম জানান, এ নিয়ে শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯ শিশুর মৃত্যুর হলো।

মাগুরা : ?মাগুরা সদর উপজেলার নরসিংহাটি গ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে জয়নাল শরীফ (৫২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। জয়নাল নরসিংহাটি গ্রামের গফুর শরীফের ছেলে। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি সিকিউরিটি সার্ভিসে কর্মরত ছিলেন।

নিহত জয়নালের ভাই হারুন অর রশিদ জানান, গত ৮ আগস্ট জয়নাল ঢাকা থেকে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে রক্ত পরীক্ষা করতে দিয়ে ওইদিনই বাড়িতে চলে আসেন। ঢাকার রিপোর্টের ভিত্তিতে ৯ আগস্ট রাতে তিনি জানতে পারেন তার ডেঙ্গু হয়েছে। পরে ১০ আগস্ট তিনি মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তার ডেঙ্গু পরীক্ষা করার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ওইদিনই তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তার পরিবারের লোকজন তাকে ঢাকায় না নিয়ে বুধবার বাড়িতে নিলে গতকাল তিনি মারা যান।

 

"