চট্টগ্রামে হুন্ডির ব্যবসা রমরমা

বিদেশ থেকে আসছে কোরবানির টাকা

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম ব্যুরো

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে হুন্ডি ব্যবসা এখন জমজমাট। দিনরাত অবৈধ এ হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হওয়ায় ব্যাংক ও সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব বা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিদেশ গমন, চিকিৎসা ব্যয় মেটানো, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, বৈদেশিক কেনাকাটা থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার নানা ক্ষেত্র এখন হুন্ডির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। তবে এ ব্যবসা বেশি জমে ওঠে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও বিশেষ দিনগুলোতে।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগমের মোবাইলে এ ব্যাপারে তথ্য জানার জন্য কল করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে, নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সহজে ধরা মুশকিল। তারা এক জায়গায় স্থির হয় না। কারণ এই ব্যবসার মূলত কোনো ঠিকানা নেই। মোবাইলের মাধ্যমে চলে হুন্ডি ব্যবসা।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীরা অনায়াসে টাকা পাঠাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই ব্যবসা দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। তাদের শক্তি ও কাজ কারবারে প্রশাসনও অসহায়। তাদের কৌশলে রিতিমতো বেকায়দায় পড়ে যায় প্রশাসনও। এক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে স্বর্ণ চোরাচালানে অর্থের জোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বেশকিছু মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানকে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হুন্ডির মাধ্যমে ডলারও পাচার করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আসে হুন্ডির মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসীরা বৈধ উপায়ে টাকা পাঠালেও দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এ টাকা তুলতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে তারা হুন্ডিকেই বেছে নেন।

অনুসন্ধান বলছে, আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীরা টাকা পাঠাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। কোনো ঝট-ঝামেলা ছাড়া মাত্র কয়েক মিনিটে টাকা হাতে পৌঁছে যায়। ফলে যে কেউ হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে যেমনটি পেতে সহজ তেমন ঝুঁকিও রয়েছে। কোনোভাবে যদি প্রশাসন খবর পায় তাহলে ব্যক্তিসহ টাকাও জব্দ হয়ে যায়। এজন্য একবার লেনদেনে যেতে কয়েকটি সিম পরিবর্তন করে। টাকা হাতে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত হুন্ডি ব্যবসায়ীরা কয়েকটি স্থান পরিবর্তন করেন। এজন্য প্রশাসনও কিছু করতে পারে না। ফলে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এই ব্যবসা চলছে দেদারছে। তবে এই ব্যবসার কিছু নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। এর মধ্যে নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজার অন্যতম। শুধু হুন্ডি নয় রিয়াজ উদ্দিন বাজার সব আর্থিক অপরাধের অভয়ারণ্য। এছাড়া নগরীর আগ্রাবাদের একটি মার্কেটের পাশাপাশি হাজারী গলি, খাতুনগঞ্জ অবৈধ ডলার বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে এখন চাঙ্গা ভাব। বিভিন্ন মানি এক্সেঞ্জ প্রতিষ্ঠানে এখন প্রকাশ্যে নগদ ডলার বেচাকেনা চলছে।

চকবাজার বাঁদুরতলা এলাকার প্রবাসীর স্ত্রী নাম প্রকাশে অনিশ্চুক জানান, আমার স্বামী দুবাই থাকে। কোরবানি গরু কেনার জন্য তিনি টাকা পাঠিয়েছেন। কীভাবে পাঠিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন হুন্ডির মাধ্যমে। তিনি প্রায় (স্বামী) টাকা পাঠান হুন্ডির মাধ্যমে। এতে কোনো ধরনের ঝামেলা হয় না। তিনি ফোন করে একটি নাম্বার দেন। ওই কল করলে ওমুক স্থানে যেতে বলেন।

জানতে চাইলে হুন্ডির লেনদেনকারী ইকবাল ফয়সাল (ছদ্মনাম) এ প্রতিবেদকে জানান, এই ব্যবসা মূলত বিশ্বাসের ওপর। বিশ্বাসের মাধ্যমে আমরা লাখ লাখ টাকা গ্রাহককে পৌঁছে দিই। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন আধুনিক যুগ। সবকিছু হাতের নাগালে। ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরে টাকা উত্তোলন অনেকে বিরক্তিবোধ করেন। এজন্য এটা একটি সহজ মাধ্যম।

এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, হুন্ডির কারণে গ্রাহক অনেক কমে গেছে। সবকিছু জানার পরও করার কিছু নেই। তিনি বলেন, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে টাকা পাঠানো অবৈধ ও ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ। এখন খুব সহজ, নিরাপদ ও স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্রাহকদের কাছে টাকা পাঠানোর উত্তম মাধ্যম হলো সরকারি বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকগুলো। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকাগুলো নিরাপদে তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছাতে মাধ্যম হিসেবে ব্যাংকগুলোই অধিক ভালো। প্রবাসীদের উচিত হুন্ডি ব্যবসায়ীদের পরিহার করা।

গত বছর ২০১৮ সালে এপ্রিলের দিকে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ওঠে আসে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবু আহমেদের নাম। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক হুন্ডি ও স্বর্ণ ব্যবসার অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত তিনি। নিজ এলাকা ফটিকছড়ি উপজেলায় আবু আহমেদের পরিচিতি গোল্ড আবু নামে। মূলত স্বর্ণ চোরাচালানের সহযোগী ব্যবসা হিসেবে হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রিয়াজউদ্দিন বাজারে অভিযান চালিয়ে ২৫০টি স্বর্ণের বার (মোট আড়াই হাজার ভরি) ও নগদ ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ।

"