যানজট আর ভোগান্তির ঈদযাত্রা

শিডিউল বিপর্যয়ে ট্রেন

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

যানজটে আটকে পড়া যাত্রীরা পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে বাড়িতে ফিরছেন রাজধানীবাসী। ঈদের আগে গত বৃহস্পতিবার ছিল শেষ কর্মদিবস। এদিন কাজ শেষেই বাস, ট্রেন ও লঞ্চঘাটে ভিড় জমাতে শুরু করে ঘরমুখো মানুষ। গতকাল শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত এ ভিড় বাড়তে থাকে।

সড়কপথ : ঘরমুখো মানুষ ফিরতে শুরু করায় মহাসড়কে পড়েছে যানবাহনের বাড়তি চাপ। এ কারণে উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজট। ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-মাওয়া সড়কেও রয়েছে চলমান যানজট ও গাড়ির ধীরগতি। তবে ফেরি বাড়ানোর কারণে যানবাহন পারাপারে তেমন জটিলতা নেই। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কেও তেমন যানজট নেই বলে জানিয়েছেন আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা।

টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাশে দীর্ঘ ৪০ কিলোমিটার এবং সেতুর পশ্চিমপাশে ১৮ কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকেই থেমে থেমে যানবাহন চলছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে যাত্রীরা। মির্জাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাশ এবং পশ্চিমপাশে মুলিবাড়ি রেলক্রসিং থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত এ যানজট ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যানজট সকাল থেকে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ কারণে যাত্রীবাহী বাস ও অন্যান্য যানবাহনকে দীর্ঘ সময় সড়কে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। চালকরা গাড়ি নিয়ে মাঝেমধ্যে একটু একটু করে আগাতে পারছেন। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে মুলিবাড়ি রেলক্রসিং থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। সেতুর পশ্চিমপাশে মুলিবাড়িতে সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকে ৯টা পর্যন্ত যানবাহন আটকে থাকে। সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয় কড্ডার মোড় থেকে নলকা সেতু পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার অংশে। সাড়ে ১১টার পর কিছুটা স্বাভাবিক হলেও মুলিবাড়ি থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে চলে যানবাহন।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও যানবাহনের ধীরগতি রয়েছে। গতকাল সকাল থেকে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় এ ধীরগতির সৃষ্টি হয়। এ কারণে মানিকগঞ্জের টেপড়া থেকে বানিয়াজুড়ি পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের মতো চলমান জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। মানিকগঞ্জ থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার আসতে লাগছে ২ ঘণ্টারও বেশি সময়। তবে পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকার অবস্থা অনেকটাই স্বাভাবিক। এখানে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিক রাখতে প্রাইভেট কারসহ ছোট গাড়িগুলো ঘাটের প্রায় সাত কিলোমিটার আগে টেপড়া থেকে রূপসা হয়ে বিকল্প সড়কে ঘাট এলাকায় আসছে। এ কারণে ঘাটের অভ্যন্তরে যানবাহনের তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা নেই।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, যানবাহনের চাপ থাকলেও যানজট নেই গাজীপুর দিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে। কোনো কোনো পয়েন্টে গাড়ি ধীরে চললেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো জটের সৃষ্টি হয়নি। কোনাবাড়ী উড়ালসড়ক চালু হওয়ায় এবং জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন সড়ক খুলে দেওয়ায় উত্তরাঞ্চলের চালক ও যাত্রীদের দুর্ভোগও কমেছে।

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, যানবাহনের হঠাৎ চাপ বেড়ে যাওয়ায় ঢাকা-কুমিল্লা সড়কে যানবাহনের ধীরগতি রয়েছে। দাউদকান্দির মেঘনা ও গোমতী নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ঢাকা থেকে কুমিল্লায় আসতে সময় লাগত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। তবে ঈদযাত্রা ঘিরে মহাসড়কের মোড়ে মোড়ে এবং সেতুতে যানবাহনের চাপ বাড়ায় গাড়ির গতি কমেছে। এ কারণে কুমিল্লায় আসতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে।

আরিচা ফেরিঘাটে যানবাহন পারাপার স্বাভাবিক। মুন্সীগঞ্জ জেলার পূর্বাংশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও জেলার পশ্চিমাংশে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে যানজট নেই।

অন্যদিকে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর অংশও ফাঁকা দেখা গেছে। হাঁসাড়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ গোলাম মোর্শেদ তালুকদার জানান, মহাসড়কে যানবাহনের চাপ আছে। তবে কোনো যানজট নেই। বরং মহাসড়ক কোথাও কোথাও ফাঁকা।

ট্রেনযাত্রা : সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে কোরবানির ঈদের ছুটি গতকাল থেকেই শুরু হওয়ায় এদিন কমলাপুরে ছিলে ব্যাপক ভিড়। তবে পশ্চিম রেলের অধিকাংশ ট্রেন আগের মতোই দেরি করে ছাড়ছে বলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমেনি।

গতকাল সকালে গিয়ে দেখা যায়, একতা এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময় সকাল ১০টায় থাকলেও এটি দেড় ঘণ্টা দেরি করে বেলা সাড়ে ১১টায় ছেড়ে যায়। মন্ত্রীর সামনেই প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে গাড়িটির জানালা দিয়েও যাত্রীরা উঠছিলেন।

খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এটি ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট দেরি করে ছাড়ে। রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস সকাল ৬টায় ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত সময় থাকলেও এটি ৫ ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে।

চিলাহাটীগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল ৮টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু ট্রেনটি সাড়ে ৪ ঘণ্টা দেরি করে দুপুর সাড়ে ১২টায় ছেড়ে যায়। রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলে এটি ছাড়তে সাড়ে ৫ ঘণ্টা দেরি হবে বলে রেলের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা জানান।

পূর্ব রেলের চট্টগ্রাম ও সিলেটের ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে গেছে বলে জানান রেলমন্ত্রী সুজন। ট্রেন যথাসময়ে ছাড়তে না পারার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোকে বঙ্গবন্ধু সেতু অতিক্রম করে যেতে হয়। এই সেতু দিয়ে প্রতিটি ট্রেন অতিক্রম করতে ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগে, প্রতিদিন ৩২টি ট্রেন এর ওপর দিয়ে চলাচল করে থাকে। সেই হিসেবে ট্রেনের সময়সূচি আর ঠিক রাখা যাচ্ছে না। যমুনার ওপর ২০২৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ হলে এ সমস্যার সমাধান হবে বলেন তিনি।

এদিকে লাইনচ্যুত বগি উদ্ধারের পর বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে ঠিক হলেও লাইনে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ট্রেন চলাচল আবারও বন্ধ হয়ে যায়। রিপোর্টটি লেখা পর্যন্ত (রাত ৯টায়) ক্ষতিগ্রস্ত লাইন দ্রুত মেরামতে কাজ করে যাচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ। রেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্তে সুন্দরবন এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুত হওয়া বগি সোয়া তিন ঘণ্টা পর উদ্ধার হলেও ঘটনাস্থলে প্রায় ৫০ মিটার রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ধারকৃত সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি তার গন্তব্যে রওনা দেওয়ার পর ধূমকেতু এক্সপ্রেস যাত্রা করলে ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইনে আটকা পড়ে যায়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ধূমকেতু এক্সপ্রেসটি ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইনে আটকা পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই পাশে নিকটবর্তী স্টেশনগুলোতে কয়েকটি ট্রেন আটকে ছিল বলেও জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে খুলনাগামী এ সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটির ‘ছয়’ নম্বর বগি বা পাশের দুটি চাকা লাইনচ্যুত হয়। বগি লাইনচ্যুত হওয়ার কারণে উত্তরাঞ্চল ও খুলনা অঞ্চলের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঈদ উপলক্ষে বাড়ি যাওয়া যাত্রীরা পড়ে যায় চরম দুর্ভোগে।

লঞ্চযাত্রা : বাস, ট্রেনযাত্রার সঙ্গে নৌপথেও ভিড় রয়েছে। গতকাল সকালে রাজধানীর প্রধান সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। এখান থেকে মূলত বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চগুলো ছেড়ে গেছে। ভোর থেকেই মানুষ লঞ্চে নিজের জায়গা পেতে ব্যস্ত সময় পার করছে। যারা জায়গা পেয়েছেন, তারা এখন অপেক্ষা করছেন লঞ্চ ছাড়ার। তবে চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের লঞ্চগুলো ছেড়ে যাচ্ছে। এসব লঞ্চে তিলধারণের জায়গা ছিল না।

 

"