কোরবানিতে চাঙা দেশের অর্থনীতি

* বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ * কোরবানির জন্য ১ কোটি ১৭ লাখ পশু * গ্রামের বাড়ি যেতে শুরু করেছে শহরের মানুষ * শহরের টাকা যাচ্ছে গ্রামে

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

শাহজাহান সাজু

মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি। বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। বেড়েছে রেমিট্যান্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ) পাঠানোর পরিমাণ। দেশে কোরবানির জন্য মজুদ রয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ পশু। বেচাবিক্রি বেড়েছে চামড়া, মসলা, দা, বঁটি, পরিবহন, পোশাকসহ নানা পণ্য সামগ্রির। তবে দেশের প্রায় ১৯টি জেলায় বন্যার কারণে এবার উৎসবে কিছুটা ভাটার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। জানা যায়, আগামী ১২ আগস্ট দেশব্যাপী পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে। তাই এই উৎসবকে সামনে রেখে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি যেতে শুরু করেছেন শহরের মানুষ। এতে শহরের টাকা যাচ্ছে গ্রামে। কারণ এরই মধ্যেই বেতন-বোনাস পেয়েছেন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা। সবকিছু মিলে দেশের অর্থনীতিতে কোরবানির আমেজ শুরু হয়ে গেছে।

এদিকে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ। তার মধ্যে গরু ও মহিষ ২ কোটি ৩৫ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া ২ কোটি ৫৫ লাখ। এ বছর কোরবানির উপযোগী ১ কোটি ১৭ লাখ পশু রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ লাখ ৫৭ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৭১ লাখ ছাগল ও ভেড়া। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ১১ লাখ পশু। তাই এ বছর কোরবানির পশুর সংকট হবে না। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিজিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ২০ লাখ গরু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সালে এসেছে ২০ লাখ ৩২ হাজার। ২০১৫ সালে এসেছিল ২২ লাখ। এদিকে পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে চামড়ার ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতি বছর দেশে দেড় কোটিরও বেশি পশুর চামড়া পাওয়া যায়। এর বড় অংশই আসে কোরবানির পশু থেকে।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ খাতের মূল বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বাজারসহ এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এ বছর কোরবানির চামড়া কিনতে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে কয়েকটি ব্যাংক। জানা গেছে, প্রতি বছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। রসুনের চাহিদা ৫ লাখ টন, আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে গরম মসলা বিশেষ করে এলাচি, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ টন এলাচি, ৭ হাজার ৬০০ টন দারুচিনি, ১৭০ টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ টন জিরা আমদানি করা হয়েছে। কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের।

কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো কামার আইটেম। ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা ছাড়া কোরবানিই সম্ভব নয়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানিতে পণ্যটির বাজার ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে বাজারে বাড়ছে টাকার প্রবাহ। ঈদ সামনে রেখে প্রবাসীরা গত বছর রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন ১৩২ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এই উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরো কয়েকটি খাতের কর্মকান্ড অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে।

জানা যায়, সারা দেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২০ লাখ দোকান, শপিংমল, বিপণিবিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে তিনজন করে হলেও ৬০ লাখ কর্মচারী ও কর্মকর্তা কাজ করছেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য মতে, নিম্নে একজন কর্মীকে ৫ হাজার টাকা ও ঊর্ধ্বে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়। গড়ে বোনাস ৮ হাজার টাকা হিসাবে এ ক্ষেত্রে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বোনাস পাচ্ছেন এ খাতের শ্রমিকরা, যার পুরোটাই ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দারিদ্র্যতা হ্রাস, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে ঈদকেন্দ্রিক লেনদেন প্রতি বছর বাড়ছে। এটিএম বুথ, ব্যাংক শাখার মাধ্যমে প্রচুর নগদ টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

"