কে হচ্ছেন ডিএমপির নতুন কমিশনার

অবসরে যাচ্ছেন আছাদুজ্জামান মিয়া

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

৩২ বছরের চাকরি জীবন শেষ করে অবসরে যাচ্ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বর্তমান কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৩ আগস্ট। এর আগেই নতুন কমিশনার পেতে যাচ্ছে ডিএমপি। সবকিছু ঠিক থাকলে আজকালের মধ্যেই তা নিশ্চিত হবে। তবে কোনো কারণে না হলে ভারপ্রাপ্ত কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে। ঈদের পরে নিয়োগ হবেন ডিএমপির নতুন কমিশনার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিদেশ সফরের কারণে ডিএমপির নতুন কমিশনার নিয়োগ চূড়ান্ত হয়নি। তবে খুব শিগগিরই নতুন কমিশনার পাচ্ছে ডিএমপি। এরই মধ্যে কমিশনারের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, সেটি নিয়ে চলছে বিভিন্ন কথাবার্তা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সব নথিপত্র গুছিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ ডিএমপি কমিশনার হিসেবে কে আসছেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে অফিসিয়াল কার্যক্রম। এই পদে সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন, চৌকস ও দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয়। এবারও তেমনটিই হতে যাচ্ছে। তবে নতুন পুলিশ কমিশনার কে হচ্ছেন সেটি ঠিক করবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে ঢাকার নতুন পুলিশ কমিশনার নিয়ে খোদ পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা। ডিএমপি সদর দফতর সূত্র জানায়, ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১১, ১২ ও ১৩ আগস্ট সরকারি ছুটি থাকবে। এর আগে ৯ ও ১০ তারিখ সাপ্তাহিক ছুটি। এ কারণে আছাদুজ্জামান মিয়ার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আজ বৃহস্পতিবার নতুন কমিশনারের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। অথবা ঈদের ছুটি শেষে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন হতে পারে। ততদিন ভারপ্রাপ্ত কমিশনার হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুসারে ডিএমপি কমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। পুলিশ সদর দফতর থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার সর্বোচ্চ চারজন কর্মকর্তার নাম যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তাদের মধ্যে পছন্দমতো একজনকে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে নিয়োগের অনুমোদন দেন। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার পরপরই ডিএমপি কমিশনার পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করবেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

এবার ডিএমপির কমিশনার হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত আইজিপি। সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে, সিআইডির প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম, পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) শেখ মারুফ হাসান ও পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও শাহাব উদ্দীন কোরেশী। তবে ডিএমপি কমিশনারের পদের জন্য চার সিনিয়রের সঙ্গে দৌড়ে আছেন দুজন জুনিয়র চৌকস কর্মকর্তাও। তারা দুজনেই ডিআইজি পদমর্যাদার। একজন হলেন ১৫তম ব্যাচের মনিরুল ইসলাম ও অন্যজন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ১৮তম ব্যাচের হাবিবুর রহমান। তাদের দুজনের বাড়িও গোপালগঞ্জে। প্রতিযোগিতায় বর্তমানে তাদের অবস্থান অনেক দূরে থাকলেও যদি কমিশনার নিয়োগে কোনো চমক থাকে তাহলে তাদের মধ্যে কেউ একজন হতে পারেন ডিএমপি কমিশনার।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ঢাকার কমিশনার হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে অতিরিক্ত আইজিপি শফিকুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে সিআইডির প্রধান হিসেবে কর্মরত। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে তার কমিশনার হওয়ার আলোচনা সবচেয়ে বেশি। তিনি ১৯৮৯ সালে (অষ্টম ব্যাচ) বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসে যোগ দেন। তার বাড়ি বৃহত্তর কুষ্টিয়ায়। তিনি ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। বিএনপি শাসনামলে তাকে দেশের দুর্গম এলাকায় শাস্তিমূলক বদলি দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়। সরকারের কাছে ক্লিন ইমেজের অফিসার হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। তিনি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি থাকায় ঢাকার সব জেলায় ইতিবাচক পরিস্থিতি বজায় রেখেছিলেন। ক্লিন ইমেজ ও ‘ডেকোরেটেড অফিসার’ হিসেবে কমিশনারের পদের জন্য এগিয়ে আছেন তিনি।

ডিএমপি কমিশনার পদের দৌড়ে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপির (চলতি) দায়িত্বে থাকা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের নামও শোনা যাচ্ছে। গত ১৬ মে তাকে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজির পদ থেকে পুলিশ সদর দফতরে অতিরিক্ত আইজিপির চলতি দায়িত্বে পদায়ন করা হয়। ১৯৮৯ সালে (অষ্টম ব্যাচ) পুলিশ সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। বর্তমান আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর ‘গুডবুকে’ আছেন তিনি।

ঢাকার দায়িত্ব পাওয়াদের তালিকায় শোনা যাচ্ছে শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসানের নামও। দুই মাস আগে মিরপুর পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৮৯ সালে (অষ্টম ব্যাচ) বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। খুলনার এই পুলিশ কর্মকর্তা এর আগে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ও সর্বশেষ নৌ পুলিশের ডিআইজির দায়িত্ব পালন করেছেন।

এদিকে কমিশনার হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি শাহাব উদ্দীন কোরেশীও। তিনিও ১৯৮৯ সালে (অষ্টম ব্যাচ) বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। এর আগে তিনি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত ৪ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তার ডেঙ্গু আক্রান্ত স্ত্রী সৈয়দা আক্তার (৫৪) মৃত্যুবরণ করেন। শাহাব উদ্দীন কোরেশী বর্তমান ডিএমপি কমিশনারের ‘গুডবুকে’ আছেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত আইজিপি (পুলিশ টেলিকম অ্যান্ড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট) ইকবাল বাহারের নামও রয়েছে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে পদায়নের আলোচনায়।

জানা গেছে, কমিশনারের দৌড়ে অপেক্ষাকৃত সিনিয়র চারজন কর্মকর্তার নামেও গুঞ্জন শোনা গেলেও জুনিয়র দুই কর্মকর্তাও প্রতিযোগিতায় আছেন। তারা হচ্ছেন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম ও ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। তাদের দুজনের বাড়িই গোপালগঞ্জে। মনিরুল ইসলাম ১৫তম বিসিএস এবং হাবিবুর রহমান ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তাদের কমিশনার হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও একজনকে ‘ভারপ্রাপ্ত কমিশনার’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, মনিরুল ইসলাম ঠান্ডা মাথায় যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর রীতিমতো জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণা করেন। জঙ্গি নিয়ন্ত্রণ, আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে তার ভালো অর্জন রয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাই এ পদে তাকে দেখা যেতেও পারে।

পুলিশ সদর দফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। অনেক সিনিয়র অফিসাররাই এ পদটি পেতে চান। তবে পুলিশ হিসেবে কর্মজীবনের সফলতা, গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা বিবেচনায় এ পদটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। সিনিয়র-জুনিয়র নির্বিশেষে যে কেউ এ দায়িত্ব পেতে পারেন।

ডিএমপির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ডিএমপি গঠনের আগে ঢাকা জেলা পুলিশ এ শহরের নাগরিক শৃঙ্খলার বিষয়টি দেখভাল করত। বর্তমানে ডিএমপির অধীনে মোট ৫০টি থানা রয়েছে। ডিএমপির সর্বশেষ যুক্ত হওয়া থানা হচ্ছে হাতিরঝিল থানা। ১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু হওয়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রথম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ই এ চৌধুরী।

 

 

"