চাহিদার চেয়ে অধিক পশু

* আমদানিনির্ভরতা কমায় লাভবান হবেন খামারিরা * চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ উৎপাদন ১ কোটি ১৮ লাখ

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

মুসলমানদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। আসছে ১২ আগস্ট ঈদ। কোরবানির ঈদকে ঘিরে দেশীয় খামারিদের পালন করা পশুতে চাহিদা মিটবে কি না এ নিয়ে সংশয়-শঙ্কায় থাকেন দেশের মুসলমানরা। অন্যদিকে কোরবানির পশু বিক্রেতাদের দুশ্চিন্তা কম থাকে না। তারা তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন পাবেন তো কোরবানির পশুর ব্যবসা করে। এবার এসব আশঙ্কার কারণ নেই। দেশে বড় করা গবাদি পশুর সংখ্যা কোরবানির হাটের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি আছে। এ কারণে বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরতা কমেছে। দেশীয় খামারিরা লাভবান হবেন এমন আভাস মিলেছে ঢাকাসহ সারা দেশের পশুসম্পদ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে।

জানা গেছে, ঈদুল আজহায় এ বছর পশুর সম্ভাব্য চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ। চাহিদার বিপরীতে দেশীয় প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত গরুর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ। সেই অর্থে বলা যায়, চাহিদার চেয়ে ১১ লাখ গরু বেশি থাকছে বাজারে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কমছে বাড়তি দুশ্চিন্তা। তবে ভারত কিংবা মিয়ানমার থেকে শেষ মুহূর্তে গরু এলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন দেশীয় খামারিরা, এমন অজানা আতঙ্ক কাজ করছে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও।

এদিকে, ঢাকায় ২৪টি স্থানে বসছে পশুর হাট। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর-দক্ষিণ) মেয়ররা এ স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর রাজধানীর বাইরে থাকছে ২ হাজার ৩৬২টি পশুর হাট। এসব হাটে উপস্থিত পশুর সুচিকিৎসার জন্য বাড়তি নিরাপত্তা থাকছে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে। একইভাবে, দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে খামারিদের বাজারে উঠানো গরুর সুচিকিৎসা দিতে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর গঠন করেছে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের জন্য পৃথক মেডিকেল টিম। সুস্থ গরুর নিশ্চয়তা যেমন দেবে ওই মেডিকেল টিম। একইভাবে পশুগুলো অসুস্থ হলে তাদের সুস্থ করবেন তারা। এ উপলক্ষে গতকাল বুধবার রাজধানীর খামারবাড়িতে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে একটি ওরেয়েন্টেশন সভা আয়োজন করা হয়।

সেখানে রাজধানীর ২৪ হাটের জন্য ২৭টি মেডিকেল টিম গঠন করে শুক্রবার থেকে রোববার রাত ৮টা পর্যন্ত মাঠে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিটি ৫ সদস্যের টিমে টিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্তব্যরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাদের সহায়তা করবেন প্রাণী অধিদফতরের দুজন এবং দুজন করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি শিক্ষার্থী। এছাড়া ঢাকার বাইরে থাকছে এ রকম প্রায় ২ হাজারের অধিক মেডিকেল টিম।

এদিকে, বাজারের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে অনলাইনেও চলছে পশু বেচাবিক্রি। গতকাল ফার্মগেটে এমনকি বিক্রেতার সঙ্গে কথা হয়। ওই বিক্রেতার নাম মঈনুল। ক্রেতা সাগর অনলাইনে ঢাকা থেকে ৯৩ হাজার টাকায় একটি গরুটি কেনেন। ঢাকা থেকে ঈশ্বরদীতে গরু পৌঁছে দিতে তাই বিক্রেতা ছোট ট্রাকে সকালেই রওনা হয়েছেন।

জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে গরু আমদানির প্রবণতা কমেছে। গত কয়েক বছরের চেষ্টায় এবার সাফল্য এসেছে। কারণ ঈদ উপলক্ষে গরুরর চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১৮ লাখ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ হাজারের অধিক বেশি পশু উৎপাদিত হয়েছে। এটা খামারিদের জন্য সুখবর। কারণ তারা লাভবান হবেন এটা আশা করছি। তিনি বলেন, এবার পশুর হাটগুলোতে আসা গরুর সুচিকিৎসার জন্য মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ঢাকার ২৪ হাটের জন্য ২৭টি টিম করা হয়েছে, আজ (গতকাল বুধবার) তাদের ওরিয়েন্টেশন সভার আয়োজন করেছি। এ টিম শুক্রবার থেকে পশুর হাটের পুলিশ কন্ট্রোল রুমের কাছে ক্যাম্প করে গরুর সুস্থতা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি কোনো পশু অসুস্থ হলে তাদের শুশ্রƒষা দেবে ওই টিম যোগ করেন অধিদফতরের ডিজি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৮ সালে কোরবানিতে পশু জবাই হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এর মধ্যে ছাগল-ভেড়া ছিল ৭১ লাখ এবং গরু ছিল ৪৪ লাখ। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের দেওয়া হিসাবে এবার দেশের খামারগুলোতে পশু রয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩টি। এর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩ এবং ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭২ লাখ। সরকারি আটটি খামারে উট-দুম্বাসহ কোরবানির পশু আছে আরো সাত হাজার। গত বছরের চেয়ে বেশি সংখ্যক পশু থাকায় এবার চোরাই পথে বাইরে থেকে কোনো পশু না এলেও কোরবানিতে পশু সংকট হবে না বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, গত বছরের চেয়ে এ বছর গরুর উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার। আর ছাগল-ভেড়ার উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ। গত এক বছরে পশু উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন লাখ। সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে গরু ও ছাগল উৎপাদনে। দেশে সারা বছর মাংসের জোগান ও কোরবানির চাহিদা মেটানোর পর বিদেশেও রফতানি হচ্ছে গরু-ছাগলের মাংস। গবাদি পশু উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে দেশে। অথচ পাঁচ বছর আগেও কোরবানির ঈদে বৈধ-অবৈধ পথে ভারত, নেপাল ও মিয়ানমার থেকে ২০ থেকে ২৫ লাখ গরু আমদানি করে দেশের চাহিদা পূরণ করতে হতো। সারা বছরের হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়াত ৪০ লাখ। ঈদুল আজহার আগে সবাই ভারতীয় গরু আসার সংবাদে মুখিয়ে থাকতেন।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, এ বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশুর চাহিদা যতই হোক না কেন তাতে পশু সংকট তৈরি হবে না। কেননা দেশের খামারগুলোতে পর্যাপ্ত পশু রয়েছে। তিনি বলেন, ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধ হলে আগামীতে দেশে পশু উৎপাদন আরো বাড়বে না হলে পরনির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।

অবশ্য গাবতলীর মাংস ব্যবসায়ী ও সাফায়েত মাংস বিতানের স্বত্বাধিকারী মো. সাফায়েত হোসেন বলেন, ভারতীয় গরুর দাম সস্তা। দেশি গরু, ছাগল, মহিষের দাম অনেক চড়া। ভারত থেকে কিছু গরু না এলে এবার কোরবানিতে গরুর দাম চড়াও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা ওই মাংস ব্যবসায়ীর। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে মুরারীপুর গ্রামে ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্টের আওতায় ২০ জনকে নিয়ে গরু পালনের একটি দল করা হয়। এই দলের সদস্যদের আমরা সিআইজি (কমিউনিটি এক্সটেনশন ওয়ার্কার) বলি। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাদের দেখে অন্যরাও উদ্বুদ্ধ হন। ক্রমে খামারির সংখ্যা বেড়ে গেলে আমরা সেখানে ইউনিয়ন সম্প্রসারণ প্রতিনিধি নিয়োগ করি। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে গরুর স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শ দানসহ যাবতীয় ভ্যাকসিন ও টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এখানকার খামারিরা গরু পালন করে নিরাপদ মাংস উৎপাদনে ভূমিকা রাখছেন, যোগ করেন অধিদফতরের ওই কর্মকর্তারা।

"