ডেঙ্গুতে আরো ৯ জনের মৃত্যু

* হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২৮৩২ * ঢাকা মেডিকেলে আইসিইউ শয্যা বাড়ছে

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

দেশজুড়ে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেই তিনজন; আর তিনজন মারা গেছেন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। তারা প্রত্যেকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এছাড়া রংপুরে এক শিশু, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল মাদ্রাসাছাত্র ও মানিকগঞ্জে একজন মারা গেছে। সব মিলিয়ে এই বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৮৩২ জন; আর মৃত্যু ঘটেছে ২৩ জনের। তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের।

তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত ঢাকায় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ৮১৮ জন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৪৬৬ জন এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৬৪ জনসহ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৮৩২ জন। এদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮৩, মিটফোর্ড হাসপাতালে ১০৪, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩৮, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৮৬, বারডেম হাসপাতালে ১৯, বিএসএমএমইউতে ৪৩, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ২৬, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২১, বিজিবি হাসপাতাল পিলখানায় ৭, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪২ এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৪৮ জন।

ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে (ঢাকা শহর ব্যতীত) ২৭৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩১ জন, খুলনা বিভাগে ১৬৪ জন, রংপুর বিভাগে ৬৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ১০৬ জন, বরিশাল বিভাগে ১২৪ জন, সিলেট বিভাগে ৩২ জন ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৬৮ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, আইসিইউয়ে শয্যা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। দুই-একদিনের মধ্যে এসব শয্যা প্রস্তুত হয়ে যাবে। এটা ছাড়াও ঈদের ছুটিতে ডেঙ্গুর ধকল সামলাতে সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সার্বক্ষণিক সেবা চালু রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক নিশ্চিত করতে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ঈদের ছুটিতে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদনÑ

ঢাকা : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চিকিৎসাধীন তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন ফরিদপুরের মোহাম্মদ কালামের ছেলে হাবিবুর রহমান (২১), মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেতুয়াধারা গ্রামের কৃষক আমজাদ ম-ল (৫২) ও চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের আহমেদপুরের মনোয়ারা বেগম (৭২)।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, হাবিবুর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৩১ জুলাই ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। গতকাল দুপুর ২টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আর আমজাদ ম-লকে সোমবার মধ্যরাতে হাসপাতালে আনা হয়। গতকাল সকাল পৌনে ৬টায় তার মৃত্যু হয়।

মৃতের ছোট ভাই রাশেদ ম-ল বলেন, আমজাদ শুক্রবার জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। আর বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগম ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৩ আগস্ট থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। তিনিও গতকাল মারা যান।

এদিকে স্বামী-সন্তান নিয়ে দেশে বেড়াতে এসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে মারা যান ইতালি প্রবাসী হাফসা লিপি (৩৪)।

হাসপাতালের পরিচালক জসিমউদ্দিন খান জানান, ওই নারী চার দিন ধরে সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আইসিইউতে থাকা অবস্থায় সোমবার রাতে তার মৃত্যু হয়। হাফসার স্বামী সরদার আবদুল সাত্তার তরুণ (৩৬) নিজেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। দুই সন্তান অলি (১২) ও আয়ানকে (৬) নিয়ে সপ্তাহ তিনেক আগে দেশে এসে কলাবাগানে উঠেছিলেন তারা। তাদের বাড়ি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ থানার সর্দার বাড়ি।

আর ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতালে গতকাল ভোরে মদিনা আক্তার নামে এক শিশু মারা গেছে। সে মতলব উত্তর উপজেলার ঘনিয়ারপাড় অক্সফোর্ড কিন্ডারগার্টেনের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা মিজানুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। দুই ভাইবোনের মধ্যে মদিনা বড়।

চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনোয়ারুল আজিম জানান, শনিবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়। এখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যান স্বজনরা। এদিকে, গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে ৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

এছাড়া ঢাকার মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হানিফ (৪২) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালের উপপরিচালক খায়রুল আলম জানান, ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে চিকিৎসাধীন হানিফ সোমবার মধ্যরাতে মারা যান।

রংপুর : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত সোমবার রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত রিহানা গাইবান্ধার পলাশবাড়ি উপজেলার আশরাফুল ইসলামের মেয়ে।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকরী অধ্যাপক সাহেদুজ্জামান রিবেল বলেন, ডেঙ্গু জ্বরসহ শিশুটিকে শনিবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সঙ্গে নিউমোনিয়াও ছিল।

রানীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) : রানীশংকৈল উপজেলায় গতকাল ডেঙ্গু জ¦রে এক মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার নেকমরদ ভকরগাঁও গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে ঢাকার মিরপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র রবিউল ইসলাম (১৭) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৯ জুলাই গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। ৩০ জুলাই জ্বর নিয়ে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতাল পরিচালক ডা. আবু মো. খায়রুল কবির তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করেন। কিন্তু তাকে ঢাকা নেওয়ার আগেই গতকাল ভোরে তার মৃত্যু হয়।

মানিকগঞ্জ : মুন্নু মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজু খান (৪০) নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত সোমবার ভোরে তার মৃত্যু হলেও বিষয়টি গতকাল নিশ্চিত করা হয়। রাজুর বাড়ি হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জ্বর ও সার্জারি সমস্যা নিয়ে গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হন রাজু খান। পরে দুই দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে তার মৃত্যু হয়।

মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. লুৎফর রহমান জানান, গতকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১১১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে সদর হাসপাতালেই ৬৭ জন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্রমেই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এ পর্যন্ত ৯৯ জন ডেঙ্গু রোগীকে শনাক্ত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল নতুন করে আরো ২০ জন ডেঙ্গু রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ২৭ জনকে জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও প্রাইভেট হাপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিরা রাজাধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিেেচ্ছন। তবে এখনো পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. শাহ আলম জানান, আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবাসহ ওষুধপত্র ও মশারি সরবরাহ করা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছি।

নাটোর : নাটোরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডেঙ্গু সেল খোলার পর ১০ দিনে জেলায় শনাক্ত হয়েছে ৫৭ জন। এদের মধ্যে গতকাল ২৪ জনকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অপরদিকে বেসরকারি সততা ক্লিনিকে এ পর্যন্ত ৩১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এদিকে ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে মানুষ এলাকায় এলে ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য সদর হাসপাতালে ১২০ কিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যা প্রায় শেষের দিকে। আরো কিটসের বরাদ্দ চেয়ে লেখা হয়েছে। বরাদ্দ না এলে ডেঙ্গু নির্ণয়ে সমস্যার সৃষ্টি হবে। সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করতে হবে।

মধুখালী (ফরিদপুর) : মধুখালীতে ১৪ ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হওয়ার খবর দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক কবির সরদার। তিনি জানান, দুই দিনে ৭ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের ফরিদপুর মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

 

"