বিবিসি বাংলাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

হেফাজতে নির্যাতনের মানসিকতা সরকারের নেই

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে কোনো ধরনের নির্যাতনের মানসিকতা সরকারের নেই এবং সরকার এ ধরনের কাজ করে না।

তিনি বলেন, ঘটনাচক্রে দুই-একটি ঘটনা ঘটতে পারে। তবে গত ১০ বছরে আমরা কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পেরেছি। শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার বিবিসিতে প্রচারিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সিনিয়র সাংবাদিক মানসী বড়––য়া এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গণতন্ত্র এবং ঋণখেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি সম্পর্কেও কথা বলেন।

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ডেঙ্গু। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সরকারের পাশাপাশি তার দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে আহ্বান করা হয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই একটা পরিচ্ছন্নতা অভিযান দরকার।

পদ্মা সেতুতে মানুষের কাটা মাথা লাগার গুজব এবং এর জেরে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে বেশ ক’জন মানুষের মৃত্যু বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা গুজব ছড়াচ্ছে, এ রকম কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। আজকের দিনে, পদ্মা সেতুতে কাটা মাথা ও রক্ত লাগবে বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আপনিই বলুন, রক্ত আর কাটা মাথা দিয়ে কি সেতু হয়? এই গুজবটা যারা ছড়াচ্ছে, অপরাধী তো তারা। পদ্মা সেতু নিয়ে শুরু থেকেই একটা চক্রান্ত ছিল।

মানসী বড়–য়া বলেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের ইতিহাস অনেক দিনের। এটি কোনো বিশেষ সরকারের আমলে যে ঘটেছে তা নয়। কিন্তু বর্তমান সরকার এ ধরনের নির্যাতন বন্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে জানতে চান তিনি। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘটনাচক্রে কিছু (দুই-একটি) ঘটনা ঘটতে পারে। বরং আপনি যদি গত ১০ বছরে আমাদের অবস্থানটা দেখেনÑ আমরা কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পেরেছি। আপনি আমার নিজের কথাটাই চিন্তা করেন, যখন আমি আমার বাবা-মা-ভাইদের সব হারালাম, খুনিদের বিচার না করে ইনডেমনিটি দেওয়া হলো, অর্থাৎ আপনি অপরাধকে প্রশ্রয় দিলেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমাকে বিচার পেতে ৩৫টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যে দেশে অপরাধকে স্বীকৃতি দিয়েই একটা সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় সেই দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। তবে আমরা যে কোনো অপরাধের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন ওইভাবে কখনই হেফাজতে মৃত্যু হয় না বা নির্যাতনও যে খুব একটা করা হয়, তাও নয়,’ যোগ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধীদের থেকে তথ্য সংগ্রহের যে কতগুলো নিয়ম রয়েছেÑ সেজন্য আমরা আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসি। তারা এজন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতিতেই অপরাধীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর বাইরে কোনো কিছু করা হয় না, এটা হলো বাস্তবতা।

শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতিকে হত্যার ঘটনার পর থেকে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, অসাংবিধানিক সরকারের সময় যারা বেশি সুযোগ ভোগ করেছে বা ক্ষমতাটা যারা উপভোগ করেছে, তারা কখনোই চায়নি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকুক।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যেসব দেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ তাদের একটি, কিন্তু এর সুফল সব পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিনা?

‘অবশ্যই পৌঁছেছে,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী। সেভাবেই আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে আমাদের দারিদ্র্যের হার ৪১ ভাগের ওপরে ছিল। আজকে সেটা ২১ দশমিক ৪ ভাগে নেমে এসেছে। মাত্র ১০ বছরের মধ্যে আমরা সেটা অর্জন করতে পেরেছি। মানুষের মাথাপিছু যেখানে ৪০০/৫০০ মার্কিন ডলার ছিল, আজকে সেখানে প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলারে সেটি উঠে এসেছে। প্রবৃদ্ধি এখন ৮ দশমিক ১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখন বেশ নাজুক অবস্থায় আছে এবং ঋণখেলাপিরা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে তা আর ফেরত দিচ্ছে নাÑ এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যতটা প্রচার হয় বিষয়টা ততটা না। ঋণ নিয়ে সেটা ফেরত না দেওয়াÑ এই কালচারটাও আমাদের এখানে শুরু হয় মিলিটারে ডিক্টেটরদের আমলে। আমরা যখন ক্ষমতায় এসেছি আমরা চেষ্টা করেছি, আমরা অনেক টাকা উদ্ধার করেছি। তারপরেও কিছু মানুষের প্রবণতা থাকে যে টাকা দিলে মনে হয় সেটি আর ফেরত দিতে হবে না।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মান ও এর চর্চা কীভাবে হচ্ছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে শেখ হাসিনা বলেন যে, দেশে এখন ৪৪টি প্রাইভেট টেলিভিশন আছে এবং তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। স্বাধীনতা না থাকলে তারা আমার বিরুদ্ধে বা সরকারের বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার করছে কীভাবে।

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ডেঙ্গু। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সরকারের পাশাপাশি তার দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে আহ্বান করা হয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই একটা পরিচ্ছন্নতা অভিযান দরকার।

তাকে প্রশ্ন করা হয়ে যে সরকারি হিসেবেই বলা হচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং এর সংখ্যা আরো বড় হবে বলে অনেকে মনে করেন। তাই কীভাবে ভবিষ্যতে মশা নিয়ন্ত্রণ আরো সুষ্ঠুভাবে করা যায়?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারো ঘরের কাছে বা ঘরে কোথাও যদি পানি জমা থাকে এবং সেখানে মশার লার্ভা তৈরি হয়, তবে তাদের জরিমানা করা হবে। মানুষ যদি আগামীর জন্য প্রস্তুত থাকে, তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি হবে না।

এদিকে দুই সপ্তাহের সফর শেষে কাল বৃহস্পতিবার লন্ডন থেকে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার বলেন, আজ (বুধবার) লন্ডন সময় সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে রওনা হয়ে কাল দুপুরের দিকে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরবেন। গত ১৯ জুলাই সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। এই সফরে তিনি ইউরোপের দেশগুলোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে লন্ডনে আয়োজিত এক সম্মেলনে যোগ দেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লন্ডনে চোখের চিকিৎসাও করিয়েছেন তিনি।

 

 

"