ডেঙ্গুতে নারী শিশুসহ মৃত্যু ৫

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় গতকাল নারী ও শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনায় এক নারী ও মাদারীপুরে মৃত্যু হয়েছে এক পোশাকশ্রমিকের। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মশাবাহিত এই রোগে ২০৬৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যা গত রোববারের তুলনায় প্রায় ২০০ জন বেড়েছে। এই অবস্থায় অধিক সতর্কতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস ও যথাসময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এদিকে, ডেঙ্গু আতঙ্কে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এই রোগ পরীক্ষার হিড়িক পড়ায় ডেঙ্গুর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটের সংকট দেখা দিয়েছে বাজারে, দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, ডেঙ্গু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় এই রোগ পরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণের সঙ্কট দেখা দেওয়ায় তা আমদানির ওপর সব ধরনের শুল্ক কর ছাড় দিয়েছে সরকার। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই সুবিধা থাকবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে ২০৬৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গেছেন। মাঝে দুই দিন নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা কিছুটা কমলেও রোববার থেকে এই ধারা আবার বাড়তির দিকে যায়। শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৭১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৪৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৬১ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ৭ হাজার ৬৫৮ জন এখনো চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে রাজধানীর ৩৮টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৪ হাজার ৯৬২ জন ডেঙ্গু রোগী। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ভর্তি আছেন ২ হাজার ৬৯৬ জন। নতুন ভর্তি হওয়া ২০৬৫ জনের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৫৯ জন এবং রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ৯০৬ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮০ জন, খুলনা বিভাগে ১৫০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১২ জন, বরিশাল বিভাগে ৯৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬১ জন, রংপুর বিভাগে ৪৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে।

ঢাকা : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আরো তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভোলার দৌলতখানের চরমালিপা গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে হাসান (১৩), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা শারমিন আরা শাপলা ও ধানমন্ডির আনোয়ারা হাসপাতালে ফরিদপুরের বোয়ালমারীর কামারগ্রামের কানাই সাহার মেয়ে অথৈ সাহা (১১) ও খুলনার খাদিজা বেগম রয়েছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, ভোলা থেকে আনার পর রোববার রাত ১টার দিকে হাসানকে হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) নেওয়া ভর্তি হন। এ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত শাপলা আবহাওয়া অধিদফতরের উপপরিচালক এ কে এম নাজমুল হকের স্ত্রী। তিনি জয়পুরহাট পৌরসভার শান্তিনগর এলাকার মৃত আবদুস সালামের মেয়ে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শারমিনকে জয়পুরহাট থেকে ঢাকায় এনে গত রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে বিকালে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

আবহাওয়া অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক জানান, একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে তিন দিন আগে দক্ষিণ কোরিয়া যান নাজমুল। তার আগে স্ত্রী ও ছেলেকে বাড়িতে রেখে আসেন। গতকালই তিনি দেশে ফেরেন।

এছাড়া ঢাকার ধানমন্ডির আনোয়ারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে বোয়ালমারীর অথৈ সাহার মৃত্যু হয়। সে বোয়ালমারী পৌর সদরের নিউ মডেল প্রি-ক্যাডেট স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। অথৈ গত ৬/৭ দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। রোববার তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। কানাই সাহার তিন মেয়ের মধ্যে সে দ্বিতীয়। কানাই সাহা ঢাকায় জুয়েলারি ব্যাগের ব্যবসা করেন।

খুলনা : ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খাদিজা বেগমের (৪০) মৃত্যু হয়। এনিয়ে জেলায় এ রোগে তিনজনের মৃত্যু হলো। খাদিজা বেগম বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার উত্তর তাফালবাড়ি গ্রামের দুলু মোল্লার স্ত্রী।

খুলনার সিভিল সার্জন এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় খাদিজা বেগম জ্বর নিয়ে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তার রক্তে প্লাটিলেট কাউন্ট খুব কম ছিল। সোমবার তার মৃত্যু হয়েছে।

এ নিয়ে খুলনায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে রোববার মঞ্জুর শেখ নামে দশম শ্রেণির এক ছাত্র এবং মর্জিনা বেগম (৬৫) নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়।

মাদারীপুর : মাদারীপুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। ?শিবচর উপ?জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মোকা?দ্দেস শা?হিন বলেন, রোববার রাত ১টার দিকে তাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রিপন হাওলাদার (৩২) মারা যান।

এই নিয়ে জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হলো। এদিকে, শিবচরে রিপন হাওলাদারের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তিনি গত শুক্রবার রাজধানী ঢাকা থেকে স্ত্রী ও ২ সন্তানকে নিয়ে নিজ বাড়ি রাজারচর গ্রামে যান তিনি। রিপন শিবচর উপজেলার সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামের হাবিবুর রহমান হাওলাদারের ছেলে। ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন তিনি।

জেলার সিভিল সার্জন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১০ দিনে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী। এখন পর্যন্ত দুজন রোগী মাদারীপু?রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গে?ছেন। মাদারীপুরের আরো তিন রোগী ঢাকা,

ফ?রিদপুর ও ব?রিশা?লে চি?কিৎসাধীন অবস্থায় মারা গে?ছেন।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে নতুন করে আরও ৫ জন ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় এ পর্যন্ত ৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৫ জন।

হাসপাতাল সুত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সনাক্ত ৪৩ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে দুইজন শিশুসহ ২৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ৬ জনকে রেফার্ড করা হয়েছে। আর বাকী ১৪ জন ছুটি নিয়ে চলে গেছে। এছাড়াও রৌমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছে ২ জন এবং ফুলবাড়ীতে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ জন।

 

 

"