জেলে বসেই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ চালাচ্ছে!

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

ঈদ ঘিরে বরাবরই সক্রিয় হয়ে উঠে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড। এবারও কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে চাঁদা চেয়ে ফোন আসার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারাগার কিংবা বিদেশে বসেই তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ‘বেতনভুক্ত’ সন্ত্রাসীদের দিয়ে চাঁদাবাজির পাশাপাশি কিলার দিয়ে ঘটানো হচ্ছে হত্যাকান্ড। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে প্রতারকচক্র ফোন করে চাঁদা চাচ্ছে। কিন্তু কয়েকজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, প্রাণভয়ে তারা চাঁদা দাবির কিছু অংশ নির্ধারিত ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দিয়েছে।

জানা গেছে, চাঁদাবাজির টাকা অনায়সেই চলে যাচ্ছে বিদেশে। দেশে সক্রিয় তাদের এজেন্টরা এসব কাজ সমন্বয় করছে। শুধু বিদেশ পলাতক সন্ত্রাসীরাই নয়, দেশে জেলবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও কারাগারে বসেই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনা তারই জানান দিচ্ছে। বিশেষ করে ঈদ ও পশুর হাটকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের চাঁদাবাজির টার্গেট নিয়েছে সন্ত্রাসী গ্রুপ। এ ছাড়া টেন্ডারবাজি, দখল, এলাকা নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করছে তারা।

গত ১৬ জুলাই শীর্ষ সন্ত্রাসী পরিচয় দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনু মুহাম্মদকে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন দিয়ে টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের গুম করার হুমকিও দেওয়া হয়। আনু মুহাম্মদ জানিয়েছেন, সেদিন সকাল ১০টার দিকে সুব্রত বাইন পরিচয়ে একটা ফোন আসে। সেই ব্যক্তি কলকাতায় তার ছোট ভাইদের চিকিৎসার জন্য টাকা দাবি করলেন। না দিলে পরিবারের সদস্য গুমসহ কীভাবে টাকা আদায় করবেন বলেও হুমকি দেন। হুমকির পর তিনি খিলগাঁও থানায় জিডি করেন। এরপর থেকে আর কেউ ফোন দেয়নি। তবে জিডি করার পরে থানা পুলিশও তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান জানান, জিডির তদন্ত হচ্ছে। জিডির একটি কপি ডিএমপির সাইবার টিমের কাছে পাঠানো হয়েছে। চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, কেবল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঢাকায় বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের জুনে বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ আলীকে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, কাঁচাবাজার ও ডিশ ব্যবসায় চাঁদাবাজির টাকার ভাগবাটোয়ারার জেরেই ফরহাদকে হত্যা করা হয়। আর এই হত্যাকান্ডের মূলে রয়েছে বিদেশে অবস্থানরত তিন সন্ত্রাসী রমজান, মেহেদী ও আশিক। তাদের মধ্যে মেহেদীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে বিদেশে অবস্থানরত পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের। পলাতক সন্ত্রাসীরা তাদের ‘বেতনভুক্ত’ কিলারদের দিয়ে এসব হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে। পুলিশের তদন্তে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য ওঠে এসেছে।

সম্প্রতি যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এর নেপথ্য রয়েছে খিলগাঁও এলাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী। মধ্যপ্রাচ্যে বসে তিনি তার ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের দিয়ে হত্যা পরিকল্পনা করেছিল। পরে একে-২২ রাইফেল ও বিদেশি পিস্তলসহ খিলগাঁওর সিপাহীবাগ এলাকা থেকে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে গোয়েন্দারা। সূত্র বলছে, ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী মধ্যপ্রাচ্য বসেই ঢাকার টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল, খুন-খারাবির নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব কাজের জন্য তার বড় ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। তার বিভিন্ন কর্মকান্ডে যুবলীগ দক্ষিণের এক নেতা বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়।

খিলগাঁও, মতিঝিল, পল্টনসহ আশপাশের অন্যান্য এলাকায় তার অনুসারী রয়েছে। মূলত তাদের দিয়েই সব কাজ করানো হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একে-২২ রাইফেল, চারটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলবার ও ৪৭ রাউন্ড গুলি সরবরাহ করেছিল। ডিবি এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্য জুয়েল ও রুবেল সম্পর্কে আপন ভাই। তারা ওই শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছে দুবাইতে একসঙ্গে ছিল। তাদের আরেক ছোট ভাই সন্ত্রাসী লিয়ন ইতোমধ্যে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।

কয়েক মাস আগে কাফরুলের হাইটেক মাল্টিকেয়ার হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসককে হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করেছে আরেক সন্ত্রাসী। ভয়ে তারা কেউই এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। তবে সর্বশেষ আরেক চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবি করলে তিনি কাফরুল থানায় গিয়ে জিডি করেন। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দারাও ঘটনাটি জানত। পরে ওই চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করেছিল পুলিশ। কিন্তু ক্রমাগত হুমকিতে ওই চিকিৎসক পুলিশকে কিছু না জানিয়ে ওই সন্ত্রাসীর লোকজনকে চাঁদা দেন।

জানা গেছে, ঈদ ও পশুর হাটকে কেন্দ্র করে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হয়েছে। মোবাইল, ইমো, ভাইভার, হোয়াটস অ্যাপস, ম্যাসেঞ্জারে সন্ত্রাসীরা তাদের বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে। ছোট-বড় ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও বাড়ির মালিকদের অচেনা নম্বর থেকে হুমকি দিচ্ছে। প্রাণের ভয় দেখিয়ে আদায় করে নিচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। এ ছাড়া জমি ক্রয়-বিক্রয়, নতুন ভবন নির্মাণ, টেন্ডার, হাটবাজার নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পলাতক সন্ত্রাসীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানি ঈদ সামনে রেখেই সন্ত্রাসীরা তাদের তৎপরতা বাড়াচ্ছে। এ সময় দেশে টাকার প্রবাহ বেশি থাকে। তাই এ সুযোগেই তারা ফায়দা লুটে নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, ভুক্তভোগীরা তাদের কাছে এসব বিষয় গোপন রাখেন। তাই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সুইডেন, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ডে বসে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে ও বেতনভুক্ত সহযোগীদের দিয়ে চুক্তিভিত্তিক খুন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে। আর চাঁদার সেই টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে হুন্ডিসহ বিভিন্ন অবৈধ পন্থায়। টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণে রাখছে তারা। প্রাণনাশের ভয়ে মুখ খুলছে না কেউ। অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশে কিংবা বিদেশি জেলে বসেই তাদের অপরাধ জগৎ দখলে রাখছে।

ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হয়তো আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরাও তৎপর রয়েছি। তাদের গতিবিধি মনিটরিংয়ে রেখেছি। এ ছাড়া পশুর হাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি নিয়েও নজরদারি হচ্ছে। সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধে নজর রাখছে গোয়েন্দারা।

২০০১ সালের ২৭ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা করে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মোট সাড়ে ১৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এরপর অপরাধজগতে নতুন মেরূকরণ হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নতুন কোনো তালিকা হয়নি। ২০১০ সালের ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪২ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা উপস্থাপন করেন। তবে সে তালিকায় দুর্ধর্ষ অনেক সন্ত্রাসীর নাম ছিল না। ওদিকে আগের ২৩ জনের তালিকার ১২ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে এখন পর্যন্ত নাগাল পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের বেশির ভাগই বিদেশে পালিয়ে থেকে দেশের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে।

"