দুই ভাগ হলো কাশ্মীর

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

কাশ্মীর ইস্যুতে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। কাশ্মীরের স্বায়ত্ত শাসনের মর্যাদার জন্য কার্যকর থাকা ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করা হয়েছে। এতে কাশ্মীরকে দুই ভাগ করা হবে। এই দুই নতুন রাজ্যের নাম হবে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ। রাজ্যসভায় গতকাল সোমবার এ-বিষয়ক বিল পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতি রাজনাথ কোবিন্দ এ বিলে স্বাক্ষর করেছেন। এ বিলকে অন্যায্য বলে সরকারবিরোধীরা রাজ্যসভায় তুমুল হট্টগোল করেছেন। কিন্তু সরকার পক্ষ এতে কান দেয়নি। এদিকে কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ৩৭০ ধারা বাতিলের এ দিনটিকে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য কালো দিবস হিসেবে অখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই কা- কাশ্মীর উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদ উসকে দেবে। তবে সরকার পক্ষ বলেছে, এখন থেকে কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে সব দিক থেকে একাত্ম হলো। ওখানকার নাগরিকরা, বিশেষ করে নারীরা নতুন করে অনেক অধিকার ভোগ করবে। বিকশিত হবে তাদের মানবিক ও মৌলিক অধিকার। কাশ্মীরের দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গৃহবন্দি করা হয়েছে রাজ্যের অন্য আরেক নেতা সাজ্জাদ লোনকে। এ ছাড়া কাশ্মীরে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ১০ হাজার নতুন সেনাসহ বিপুলসংখ্যক আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রীনগর ও জম্মু অঞ্চলে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্কুল-কলেজ। রাজ্যসভায় তুমুল হই-হট্টগোলের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে সংশোধিত জম্মু-কাশ্মীর বিল পেশ করেছেন। এই বিলের মাধ্যমে কাশ্মীরকে লাদাখ ও জম্মু-কাশ্মীর। অর্থাৎ জম্মু-কাশ্মীর আর আলাদা করে রাজ্যের মর্যাদা পাচ্ছে না। জম্মু-কাশ্মীরে এবার কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লাদাখকে জম্মু-কাশ্মীর থেকে আলাদা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এরপর নজিরবিহীনভাবে সংসদে সংশোধিত জম্মু-কাশ্মীর বিল পেশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজ্যসভা। প্রস্তাবের বিরোধিতায় সরব হন গুলাম নবি আজাদ, রামগোপাল যাদবসহ অন্য বিরোধীরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়। পরে ফের অধিবেশন শুরু হলে বিরোধীদের হই-হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির নির্দেশনামা পড়ে শোনান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিল পাস হয়ে যায়। ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিলে সই করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। প্রস্তাবিত নয়া বিল অনুযায়ী, জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্র সরকার। রাজ্যসভায় অমিত শাহ এই প্রস্তাব দেওয়ার পরই তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। এ পর্যায়ে বিলটি পাস হয়।

অন্যদিকে, কাশ্মীর ইস্যুতে কেবিনেট বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে কী বিবৃতি দেন, তা জানতে পুরো দেশ ছিল উদ্বেল। বেলা ১১টায় সংসদে বিবৃতি দিতে ওঠেন অমিত শাহ। এরপর সংসদে সংশোধিত জম্মু-কাশ্মীর বিল পেশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্যসভায় যা ঘটেছে, তা নজিরবিহীন। রামগোপাল যাদব, গোলাম নবি আজাদরা কাশ্মীরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মোদি সরকার তাতে কান দেয়নি। ৩৭০ ধারা রদ বিল পাস হওয়ার পরই ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিরোধীরা। রুল বুক নিয়ে চেয়ারম্যান ভেঙ্কইয়া নাইডুর টেবিলের কাছে পৌঁছে যান তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়েন। তার অভিযোগ, যে বিল সার্কুলেট হয়নি, সেটি কীভাবে রাজ্যসভায় পাস করে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ? কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। আজকের দিন ভারতের গণতন্ত্রের জন্য কালদিন বলে মন্তব্য করেছেন মেহবুবা মুফতি। তিনি আরো বলেছেন, এতে কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দেবে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ করে স্বাধীনতা অর্জনের সময় জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অঙ্গরাজ্য ছিল না। জম্মু-কাশ্মীর তখন ছিল মহারাজা হরি সিংয়ের স্বাধীন রাজত্ব। ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর কাশ্মীর আক্রমণ করে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট আফগান ও পসতুন বন্দুকবাজরা হরি সিংয়ের এই রাজ্য আক্রমণ করে। সে সময় রাজত্ব বাঁচাতে মহারাজা হরি সিং ভারতের কাছে সেনা সাহায্য চান। ভারত সাহায্য দেয়। তবে শর্ত ছিল জম্মু-কাশ্মীরকে সংবিধানের বিশেষ ৩৭০ নম্বর ধারা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার সংস্থান রাখা। তখন বিনা পারমিটে কাশ্মীরে কেউ প্রবেশ করতে পারতেন না। কার্যত, প্রতিরক্ষা-বিদেশ বা যোগাযোগের মতো কয়েকটি বিষয় ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে, ভারতের কোনো আইন প্রয়োগ করতে গেলে রাজ্য সরকারের সম্মতিও ছিল আবশ্যিক। নাগরিকত্ব, সম্পত্তির মালিকানা বা মৌলিক অধিকারের প্রশ্নেও জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দারা বাকি দেশের তুলনায় বাড়তি কিছু সুবিধা ভোগ করেন। আর ৩৭০ ধারা অধিকার বলেই তারা তাদের সেই অধিকার পেয়েছে। ৩৭০ ধারার ভিত্তি আসলে খুবই ইতিহাসভিত্তিক, ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযুক্তিকরণের ইতিহাস, এর সঙ্গে জড়িত।

অন্যদিকে, ১৯২৭ ও ১৯৩২-এ করদ রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরে স্থায়ী বাসিন্দা আইন চালু হয়েছিল। তৎকালীন শাসক মহারাজা হরি সিং তা চালু করেছিলেন। ১৯৪৭-এর অক্টোবরে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন মহারাজা হরি সিং। ডোগরার রাজাদের শাসনকালের মেয়াদ শেষে কাশ্মীরের আধিপত্য দখল করেন শেখ আবদুল্লাহ। ১৯৪৯-এ নয়াদিল্লির সঙ্গে শেখ আবদুল্লাহর আলোচনার পর জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বলে। বিশেষ মর্যাদার জেরে প্রতিরক্ষা, বিদেশ এবং যোগাযোগÑ এই তিন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আইন প্রযোজ্য ছিল না কাশ্মীর উপত্যকায়। তবে ১৯৫২-তে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও শেখ আবদুল্লাহর মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে ভারতীয় সংবিধানের বহু আইনই সেখানে কার্যকর হয় এবং ৩৫-এ ধারাও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০২ সালে জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে বাতিল হয় ৩৫-এ ধারায় মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার আইন। ওই ধারা অনুযায়ী, রাজ্যের বাসিন্দা কোনো মহিলা রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তার উত্তরাধিকারীদেরও সম্পত্তির ওপর অধিকার থাকে না। তবে, হাইকোর্টের নির্দেশে বিয়ের পরও অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না মহিলারা। ৩৫-এ ধারার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ বেশ কয়েকজন আবেদনকারী। ৩৭০ ধারা ভারতীয় সংবিধানের একটি অস্থায়ী সংস্থান, টেম্পোরারি প্রভিশন। এই ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা ও বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ১১ নম্বর অংশে অস্থায়ী, পরিবর্তনশীল এবং বিশেষ সংস্থানের কথা বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ীই জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সংবিধানের ধারাগুলো অন্য সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নাও হতে পারে। ১৯৪৭ সালে এই ৩৭০ ধারার খসড়া প্রস্তুত করেন শেখ আবদুল্লাহ। জম্মু-কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী মহারাজা হরি সিংহ এবং জওহরলাল নেহরু তাকে নিয়োগ করেন। তবে শেখ আবদুল্লাহ অস্থায়ীভাবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না, বরং স্থায়ীভাবে জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষপাতী ছিলেন। যদিও কেন্দ্র তার সেই দাবি মেনে নেয়নি। ফলে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েও ৩৭০ ধারা বলে জম্মু-কাশ্মীর ছিল আলাদা স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য, যদিও সেই স্বায়ত্তশাসন ছিল অস্থায়ী। গতকাল সোমবার রাষ্ট্রপতির নির্দেশনামার জেরে এই ৩৭০ ধারা এবং তার অধীনে থাকা ৩৫-এ ধারা বিলুপ্ত হয়ে গেল। ফলে সব দিক থেকেই বিশেষ মর্যাদা হারাল জম্মু-কাশ্মীর। দিল্লি, গোয়ার মতো দেশের বাকি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে আর কোনো পার্থক্য থাকল না জম্মু-কাশ্মীরের। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত জম্মু-কাশ্মীরে রাজ্যপালের জন্য সদর-এ-রিয়াসত চালু ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর বদলে ছিল প্রধানমন্ত্রী। যদিও ১৯৬৫ সালের পর তা উঠে যায়। এর আগে ১৯৫৬ সালে সংবিধানের ২৩৮ ধারা উঠে যায়। এই ধারায় দেশীয় রাজ্যগুলো তুলে দিয়ে সাধারণ রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সেই সময়ও জম্মু-কাশ্মীরকে এর বাইরে রাখা হয়। এমনকি, কোনো আইন প্রণয়নের অধিকার ছিল না কেন্দ্র বা লোকসভার। আইন প্রণয়ন করতে হলে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের সহমত নিতে হতো। ৩৭০ ধারার অধীনেই ছিল ৩৫ ধারা। এই ৩৫-এর ধারা অনুযায়ী কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাও বিশেষ সুবিধা পেতেন। স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য রাজ্যের কেউ সেখানে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে পারতেন না। কিনতে হলে অন্তত ১০ বছর জম্মু-কাশ্মীরে থাকতে হতো। এবার যেকোনো রাজ্যের বাসিন্দা সেখানে জমি কিনতে পারবেন।

"