প্রিয়া সাহার ‘বিতর্কিত’ মন্তব্যে তোলপাড়

পাঁচ মামলা খারিজ নিন্দা অব্যাহত

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের একটি সম্মেলনে বাংলাদেশি নাগরিক ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যে ‘বিতর্কিত’ বক্তব্য দিয়েছেন, তার রেশ এখনো কাটেনি। তার সেই বক্তব্যকে ঘিরে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। ‘ডাহা মিথ্যা’ নালিশে নিন্দার ঝড় বইছে। মুসলমানসহ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরাও তার সেই বক্তব্যের নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তিন দিন ধরে প্রিয়া সাহার ওই মিথ্যা বক্তব্যটিই এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। এর মধ্যে গতকাল রোববার ঢাকায় দুটিসহ তিন জেলায় পাঁচটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। পরে শুনানিতে সেসব মামলা খারিজ হয়ে যায়। প্রিয়া সাহা একটি ভিডিও বার্তায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এ সময় তিনি দেশে আসার কথাও বলেন। তার দাবি, তিনি কোনো অন্যায় করেননি।

এদিকে প্রিয়া সাহার বক্তব্যে সরকার বিব্রত ও ক্ষুব্ধ। তবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশে ধীরনীতি অবলম্বন করছে সরকার। সরকার ধীরনীতি অবলম্বন করলেও প্রিয়া সাহা ও তার চার পুরুষ সম্পর্কে গ্রাম ও শহরে ঝড়োগতিতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। কে এই প্রিয়া সাহা, তার পৈতৃক ও বৈবাহিক সূত্রে নাম-পরিচয়, তার এনজিও, স্বামীর চাকরি, সন্তান কে কোথায় রয়েছেন, সম্প্রতি আমেরিকা সফরের আগে-পরে কাদের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে, সেসব খতিয়ে দেখছে পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। বিশেষ করে আমেরিকায় পাড়ি জমানো সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও নোবেলজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কোনো ধরনের ইন্ধন রয়েছে কি নাÑ তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত তিন দিনে সরকারের একাধিক মন্ত্রী এটিকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাকে শিগগিরই আইনের আওতায় আনারও হুশিয়ারি দেন। তবে গতকাল লন্ডন সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, প্রিয়া সাহাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে নিষেধ করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রিয়া সাহা কেন এমন কাজ করেছেন, এ বিষয়ে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিত। তার আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য পাওয়ার আগে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।

গত ১৬ জুলাই হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত চীন, তুরস্ক, উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমারসহ ১৬টি দেশের সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার এমন ২৭ জন ব্যক্তির সাথে একান্তে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় প্রিয়া সাহা বলেন, ‘স্যার, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সেখানকার ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান গুম হয়ে গেছে। দয়া করে বাংলাদেশি জনগণকে সাহায্য করুন। আমরা দেশ ছাড়তে চাই না, থাকতে চাই।’ ট্রাম্প তখন বলেন, ‘বাংলাদেশ?’ জবাবে হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে ওই বাংলাদেশি নারী আরো বলেন, ‘এখনো সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু মানুষ থাকে। আমার অনুরোধ, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা দেশ ছাড়তে চাই না। সেখানে থাকতে আমাদের সহযোগিতা করুন। আমি আমার বাড়ি হারিয়েছি। তারা বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার জমি ছিনিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কোনো বিচার হয়নি।’ তখন ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করেন, ‘কে জমি নিয়ে গেছে?’ উত্তরে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলো। তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে আসছে।’

পরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এবিসি নিউজের একটি ভিডিও প্রিয়া সাহার কথোপকথনের বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এ নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের সমালোচনা-আলোচনা শুরু হয়। ওই ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে নানা মন্তব্য করেন অনেকেই। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে অনেকেই কমেন্ট করে নিন্দা জানায়, যা এখনও চলছে। তবে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের দায় নিচ্ছে না হিন্দু সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলো। তারা বলছে, এই বক্তব্য একান্তুই প্রিয়া সাহার। এর সঙ্গে সংগঠনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

এদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রিয়া সাহা যে নালিশ জানিয়েছেন তা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়, বরং এটা ছোট্ট একটি ঘটনা। বিএনপি-জামায়াতের সময় ছাড়া বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। প্রিয়া সাহা তার ব্যক্তিগত ঈর্ষা চরিতার্থের জন্য এটা করেছেন। এত ছোট্ট ঘটনায় রাষ্ট্রদ্রোহ হয়ে গেছে, তা কখনোই মনে করি না। তার এই বক্তব্যের পর মামলা খারিজ হওয়ার খবর আসে। এ দিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ প্রিয়ার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন। তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীও। অন্যদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন, তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

রাষ্ট্রদ্রোহের পাঁচ মামলা খারিজ : গতকাল প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে ঢাকায় দুটিসহ তিন জেলায় মোট পাঁচটি মামলা করা হয়। মামলায় প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়। ঢাকায় দুটি মামলা খারিজ করে দেন আদালত। গতকাল বিকেলে ঢাকা বারের কার্যনির্বাহী সদস্য ইব্রাহীম খলিলের করা মামলার আবেদন খারিজ করে দেন। তিনি প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছিলেন। একই অভিযোগে করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের মামলাটিও দুপুরে খারিজ করে দেন আদালত।

রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে মো. আসাদ উল্লাহ্ একটি মামলা করেন। পরে শুনানিতে সেটি খারিজ করে দেন আদালত। সিলেট মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রিমাদ আহমদ রুবেলের মামলাটিও খারিজ করে দেন আদালত। ঝালকাঠির আদালতে শহর যুবলীগ যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ছবির হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। শুনানির পর সেটিও খারিজ হয়ে যায়। এ ছাড়া, একই অভিযোগে খুলনায় পৃথকভাবে মামলার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান জামাল ও জনৈক মদন কুমার সাহা। তবে সেসব মামলা আমলেই নেননি আদালত।

ক্ষোভ-নিন্দা জানিয়ে দুই সংগঠনের বক্তব্য : মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রিয়া সাহার করা অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে দাবি করেছে সম্প্রীতি বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘৩৭ মিলিয়ন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষ নিখোঁজ হয়েছে, প্রিয়া সাহার এমন তথ্য অবাস্তব ও বানোয়াট বলে ধরে নেওয়া যায়। তার এ নির্লজ্জ মিথ্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। তিনি কাদের প্ররোচনায়, কোন উদ্দেশ্যে এমন মিথ্যাচার করেছেন, সে বিষয়ে একটি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। সুষ্ঠু তদন্তে অবশ্যই থলের আসল বেড়ালদের চেহারা বেরিয়ে আসবে।

অন্যদিকে ইন্টার রিলিজিয়ান হারমোনি সোসাইটি নামে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে গতকাল বলা হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন সম্পর্কে প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন, তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বহুবিধ নির্যাতনের কল্পকাহিনি উপস্থাপন করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন। তার রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

কে এই প্রিয়া সাহা : হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা। গত মাসে প্রকাশনার অনুমতি পাওয়া মাসিক ‘দলিত কণ্ঠ’ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক। পত্রিকায় প্রিয়া সাহার পুরো নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রিয় বালা বিশ্বাস’। তিনি ‘শারি’ নামে একটি এনজিওর নির্বাহী পরিচালক। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী প্রিয়া ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি মহিলা ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিভ্রান্তিমূলক কর্মকা-ের জন্য গত বছর তিনি পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। তার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার নাটক করে প্রচুর বিদেশি ফান্ড সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গার চরবানিরীতে। স্বামী দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী উপপরিচালক মলয় সাহা। তারা ঢাকার ধানমন্ডিতে থাকেন। তাদের দুই মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মী সাহা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করছেন।

 

"