বিরোধীদলীয় নেতা হচ্ছেন রওশন!

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এমনই সিদ্ধান্তের কথা জানান দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান হয়েছেন মূলত এরশাদের দেওয়া গাইডলাইন মেনেই। দলীয় সূত্র জানায়, এরশাদের চাওয়া অনুযায়ী এবার বিরোধী দলের নেতার আসনে বসতে পারেন রওশন এরশাদও। এরশাদোত্তর দল পরিচালনায় যৌথ নেতৃত্বের কথা বলছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। সেই হিসেবে দলের গঠনতন্ত্রেও আনতে হবে পরিবর্তন। এর বাইরে দলের সংসদীয় নেতা ও উপনেতা নির্বাচন করতে যাচ্ছে দলটি। তবে সব ঠিক থাকলে আগের মতো এবারও সংসদে বিরোধী দলের নেতার আসনে বসতে পারেন রওশন। রওশন এরশাদ যদি বিরোধী দলের আসনে বসেন; তা হলে দলের সংসদীয় উপনেতা পদে কে আসছেন, তা নিয়েই রয়েছে যত জল্পনা।

অনেকে বলেছেন, দলের চেয়ারম্যান হিসেবে এরশাদ যেহেতু সংসদের বিরোধী দলের নেতা ছিলেন; সেই হিসেবে জি এম কাদেরও সেই চেয়ারে বসতে পারেন। তবে দলের নেতারা এ নিয়ে স্পষ্ট দুটি পক্ষ নিয়ে আছেন। চেয়ারম্যান পদটিতে জি এম কাদেরের নিযুক্তির পর বিরোধী দলের নেতার আসনে রওশন এরশাদকে বসাতে একটি পক্ষ অনড় অবস্থানে আছে। তারা মনে করছেন, গত সংসদে রওশন ঠিকমতোই তার দায়িত্ব পালন করেছেন। বিরোধী নেতা হিসেবে তার কর্মকান্ডে সরকারও খুশি। এরশাদের অবর্তমানে তাই এবার তাকে মনোনয়ন দিতে সরকারের সমর্থন পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন নেতারা। তাদের যুক্তি হচ্ছে, জি এম কাদের সরকারপ্রধানের গুডবুকে থাকলেও বিরোধী নেতা হিসেবে সরকারের পছন্দে থাকবেন রওশন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, জি এম কাদের অনেকের সঙ্গেই আপস করে চলেন বিধায় তার প্রতি সরকারের আস্থা কম।

তবে রওশন বিরোধীরা মনে করছেন, এরশাদ জীবিত অবস্থায় দলের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন জি এম কাদেরকে। অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে ‘ফ্রি মোডে’ সব ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি এরশাদ। তাই এবার এরশাদের মতো অবস্থায় নেই জি এম কাদের। আর তাই দলে রংপুর ইজম কাজে লাগিয়ে একটি পক্ষ রওশনের প্রভাব কমাতে উঠে পড়ে লাগবে, এটা স্বাভাবিক। তারা মনে করছেন, দলের প্রেসিডিয়াম এবং সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই জি এম কাদেরের পক্ষে আছেন। রওশন চাইলেও কিছু করতে পারবেন না। কোনো বিষয়ে বিশেষ সুবিধা নিতে হলে জোটসঙ্গী হিসেবে তাকে সরকারের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।

জাপার প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, একটি অংশ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদকে চাইছে বিরোধীদলীয় নেতার পদে। এই পক্ষটি এরশাদের জীবদ্দশায় ‘এরশাদবিরোধী’ অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। আসন্ন প্রেসিডিয়ামের সভায় রওশনপন্থিরা যুক্তি তুলে ধরবেন। এই পক্ষের যুক্তি, এরশাদ জীবিত অবস্থায়ই নিজের স্ত্রীকে দশম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই রওশনকে গুরুত্বসহ পার্টিতে জায়গা দিয়েছেন এরশাদ।

রওশনপন্থি একাধিক প্রভাবশালী নেতা এও দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জি এম কাদের মহাজোটের মন্ত্রিসভায় থাকলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে হঠাৎই অবস্থান পরিবর্তন করেন। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এখনো আপত্তি থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে রওশন এরশাদকেই নিরাপদ মনে করা হতে পারে। প্রেসিডিয়ামের আরেক সদস্য দাবি করেন, ‘এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার একতা, ঐক্য একমাত্র রওশন এরশাদের দ্বারাই সম্ভব। পার্টি কে চালাবে, সেটা বড় কথা নয়। অনেক দলেই এটা হচ্ছে, যিনি প্রবীণ তাকে সামনে রেখেই দল পরিচালিত হয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত দুই বছরে পার্টিকে সময় দেননি, তবে দল কিন্তু তার নামেই চলেছে। সেক্ষেত্রে রওশন এরশাদ দলে সিনিয়র। দলকে একত্রিত রাখতে চাইলে রওশনের কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া পারিবারিক ধারাবাহিকতার দিক থেকেও রওশনই পাওয়ার যোগ্য।

পার্টিতে রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, এ নিয়ে পার্টির প্রেসিডিয়ামে আলোচনা হবে। রওশন এরশাদ জাপার শুরু থেকেই আছেন। এরশাদ তাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সব সময় দলে জায়গা দিয়েছেন। তিনি দলে প্রাজ্ঞ। রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবনের শুরু থেকেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে ছিলেন রওশন। এ ছাড়া তিনি তো বিগত একটি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন। এর পরও আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত হবে।’

জানতে চাইলে জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে রওশন এরশাদ তো আছেনই। তিনি উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ১০ দিনের মধ্যে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মিটিং করে এ বিষয়টির সমাধান করব। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদের অভিজ্ঞতা আছে, এ প্রসঙ্গে মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘তার অভিজ্ঞতা তো আছেই। তবে তিনি হবেন কি না, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কারণ, এ বিষয়ে পার্টির কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে কে বসবেন, এ নিয়ে জাপার অভ্যন্তরে দুই পক্ষ থাকলেও উভয় অংশের নেতারাই জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সরকারের সবুজ সংকেত যার দিকে থাকবে, তাকে অপজিশনের সিটে বসার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে।

 

"