উপসর্গ পাল্টে আঘাত হানছে ডেঙ্গু

* সামান্য জ্বর হলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে পরামর্শ * এক বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮৫২

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

আলাদা চেহারা নিয়ে এবার হাজির হয়েছে ডেঙ্গু। জ্বরের মাত্রা কম, র‌্যাশ দেখা যায় না, ব্যথাও হয় না। অনেকে বুঝতেই পারেন না যে, তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। একে ‘শকড সিনড্রম ডেঙ্গু’ আখ্যা দিয়ে ঝুঁকিও বেশি বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে এ বছর গত সোমবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সারা দেশে ৪ হাজার ৮৫২ জন। তারা এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও বিভিন্ন সূত্র বলছে শিশুসহ ১২ জন মারা গেছেন। খবর ডয়চে ভেলের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি জুলাই মাসের ১৬ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৭ জন যা গত পাঁচ মাসের সমান। জুলাই মাসে গড়ে প্রতিদিন ১৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ১৬ জুলাই ভর্তি হয়েছেন ১৭১ জন। একদিনে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভর্তি হয়েছেন ২৭৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, এপ্রিল মাসে দুজন এবং জুলাই মাসে একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী গত বছর সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৮৪ জন সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তার মধ্যে ২৬ জন মারা যান। তার আগে ২০০২ সালে ৬ হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল।

কিন্তু এবার জুন ও চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১৬ দিনের যে চিত্র তাতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কমিউনিকেবল ডিজিজ শাখা থেকে চলতি বছরের ৩ থেকে ১২ মার্চ ঢাকার দুই সিটি এলাকার ৯৭টি ওয়ার্ডে একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপে ১০০টি জায়গার ৯৯৮টি বাড়ি থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আর সেই নমুনায় ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশার উচ্চমাত্রায় লার্ভা পাওয়া যায়। পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিক ড্রাম, বালতি, নির্মাণাধীন বাড়ির খোলা ট্যাংক, ফুলের টব থেকে যে পানির নমুনা নেওয়া হয় সেই পানিতে এডিস মশার লার্ভা ছিল সর্বোচ্চ। উত্তর সিটির আটটি এবং দক্ষিণ সিটির ১৫টি ওয়ার্ডকে সর্বাধিক ডেঙ্গু প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, এবার ‘শকড সিনড্রম’ বেশি হচ্ছে। এর আগে আমরা দেখেছি, হেমোরেজিক ডেঙ্গু। শকড সিনড্রমে শরীরে পানি কমে যায়, তাপ বেড়ে যায়, হার্ট বিট কমে যায়, ব্লাড প্রেসার কমে যায় এবং রোগী জ্ঞান হারাতে পারেন। ফুসফুস এবং পেটে পানি জমে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ হয়, শরীরে র?্যাশ উঠে, তাপমাত্রা ১০৪ থেকে ১০৫ হয়। এটার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ পরিচিত। তাই সে বুঝতে পারে কি করতে হবে। কিন্তু এবারের ডেঙ্গুতে তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি, র‌্যাশ দেখা যায় না, রক্তক্ষরণও হয় না। ফলে অনেকে বুঝতেই পারেন না যে, তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত বা গুরুত্ব দেন না। জ্বর চলে যাওয়ার পরে প্ল্যাটিলেট ভেঙে ব্লাডপ্রেসার কমে কলাপস করে। ফলে এবার মৃত্যুর হার বেশি।

তিনি বলেন, আগে আমরা বলতাম তিন দিন দেখার জন্য। কিন্তু এবার যে ধরনের ডেঙ্গু তাতে কারোর সামান্য জ্বর হলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কোনো দেরি করা যাবে না। জ্বরের সঙ্গে বমি ও লুজ মোশনও ডেঙ্গুর লক্ষণ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহও বলেন, এবার ডেঙ্গু মোডিফায়েড ফর্মে এসেছে। লক্ষণ আগের মতো নয়। তাপমাত্রাও বেশি থাকে না, ১০১ থেকে ১০২ ডিগ্রি। হেমোরেজিক নয়, শকড সিনড্রম। হাড়ে বা শরীরের সংযোগস্থলে ব্যথাও হয় না। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না। তাই আমারও পরামর্শ অল্প বা বেশি যে কোনো মাত্রার জ্বর হলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। অপেক্ষা করা চলবে না।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে হিসাব দিচ্ছে, আর আমরা যে খোঁজখবর পাচ্ছি তাতে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। আমরা একজন চিকিৎসকেরও মৃত্যুর খবর পেয়েছি। কেউ যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হন তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি।

তিনি আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, জ্বর হলেই প্রচুর পানি ও পানীয় খাবার খেতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। জ্বরের মাত্রা যাই হোক না কেন।

"