বিশ্বকাপ নিয়ে ময়নাতদন্ত

জয়-পরাজয় ছাপিয়ে ক্রিকেটের রোমাঞ্চ

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

আরিফ সোহেল

ক্রিকেটের তীর্থভূমি লর্ডসে এর আগে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পরশু সেই লর্ডসেই ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে যা ঘটেছেÑ তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য-বিস্ময়কর। যার প্রতিকণায় রোমাঞ্চ ছড়ানো ছিল। পঞ্চমবারের জন্য বিশ্বকাপ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে লর্ডসে। তবে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো টানটান উত্তেজনা আর কখনো দেখেনি ক্রিকেট দুনিয়া। যে ম্যাচ দেখে ক্রিকেট-জনতা অভিভূত। জয়-পরাজয় ছাড়িয়ে জয় হয়েছে ক্রিকেটের।কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার বলেছেন, ‘প্রথম বল থেকে ৬১২ বল অবধি টানটান উত্তেজনার খেলা, খারাপ লাগছে নিউজিল্যান্ডের জন্য। ওরা সবই করেছে ইংল্যান্ড যা করেছে, কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার জন্য সেটাও যথেষ্ট হলো না।’

আইসিসির নিয়মের বেড়াজালে হেরে যাওয়া সত্যিই কষ্ট-বেদনার। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আইসিসির নতুন নিয়মে সুপার ওভার টাই হলে যে দল বেশি বাউন্ডারি মেরেছে, তারাই জয়ী হবে। এমন অভাবিত ম্যাচ নিয়ে আগে কেউ কিছু লিখেছে কি না পড়া হয়নি। তবে কথা উঠেছে গাপটিলের থ্রো স্টোকসের ব্যাটে লেগে হওয়া চারে ৪ রান দেওয়া নিয়েও। কারো মতে, এটা পাঁচ রান হওয়ার কথা ছিল। আইসিসির নিয়মও সে রকমই বলছে।

আবার ব্যাটসম্যানদের জয়। ফাইনালের ভাগ্যবিধাতা বাইন্ডারি হিসাব-কিনাশ। আবার বোলাররা স্পটলাইটের বাইরে। বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ড জিতেছে বাউন্ডারির কল্যাণে। এ নিয়ে আলোচনা, যুক্তি পাল্টা যুক্তি চলছে; চলবে সামনেও। কিন্তু পাল্টানো যাবে না ফাইনাল রেজাল্ট। অনেক নাটকের রং ছড়ানো রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ শেষে ক্রিকেট সূতিগারের দেশ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরুর ৪৪ বছরে এসে জিতেছে স্বপ্নময় শিরোপা। সেই জয় মসৃণ হলো বটে; থেকে গেছে নানা প্রশ্ন। তবে আবার প্রমাণিত ক্রিকেট শতভাগ অনিশ্চয়তার খেলা। কোন বলে কী ঘটে যায়Ñ তা আগে থেকে বলা মুশকিল।

প্রশ্নবিদ্ধ আইনের ফাঁক গলিয়ে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছে ইংল্যান্ড। এ জয়ে ইংল্যান্ডই প্রথম দেশ যারা একসঙ্গে ক্রিকেট, ফুটবল ও রাগবি বিশ্বকাপ জয়ের বিরল ইতিহাস গড়ল। ইংল্যান্ডের প্রথম সাফল্য আসে ১৯৬৬ সালে।

ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রিটিশরা। ২০০৩ সালের ফাইনালে আয়োজক অস্ট্রেলিয়াকে ২০-১৭-এ হারিয়ে রাগবি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন এই ইংল্যান্ডই।

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের রেকর্ড সত্যিই ইতিহাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বাস-প্রত্যাশার কোনো সীমানায়ই এমন ম্যাচের পা-ুলিপি রচিত হয়নি। হলফ করে বলছি, এমন ফাইনাল ম্যাচের জন্য অনেক যুগ অপেক্ষায় থাকবে ক্রিকেট দুনিয়া। ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ৫০ ওভারে টাই হওয়ার পর সুপার ওভারেও সমান রান। ম্যাচের মীমাংসা না-হওয়ায় বেশি বাউন্ডারির নিরিখে ২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছে ইংল্যান্ড।

সবুজ পিচে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত একটু হলেও ভুলের রাজ্যের অনুঘটক। ফলে ‘ব্যাটিং ব্যাটিং ব্যাটিং’ সেøাগান মুখরিত বিশ্বকাপের রানের চাকা বাণে পরিণত করতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। সবুজ পিচে পেসারদের রাজত্ব অনিবার্য এই রূপ দেখেছে দুদলই। নিউজিল্যান্ড ব্যাটিং যেমন সচ্ছন্দ হারিয়েছে, হারিয়েছে ইংল্যান্ডও। ফলে ম্যাচের গতিপথ নির্ধারিত হয়েছে বোলারদের ইচ্ছামতোই। তারপরও ইংল্যান্ডের এই জয় স্বয়ং ভাগ্যদেবী নিজ হাতেই তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে শেষ ওভারে ডিপ মিড উইকেট থেকে গাপটিলের ছোড়া বল স্টোকসের ব্যাটে লেগে চারে চলে যাওয়ার আর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

তবে বলতে দ্বিধা নেইÑ ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড এই দুই দলের অসাধারণ ক্রিকেটীয় রং অবগাহন করেছে বিশ্বকাপ ফাইনাল। জিততে পারত যে কেউ। আইসিসির অদ্ভুত নিয়মে ম্যাচে কিউইদের থেকে ছয়টি বেশি চার মারার শিরোপা জিতেছে ইংল্যান্ড। পরপর দুবার ফাইনালে উঠেও হারের যন্ত্রণায় কষ্টের সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়েছে নিউজিল্যান্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে স্নায়ু-উত্তেজক ফাইনাল জিতে ২০১৯ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন মরগানরা।

"