এরশাদ-পরবর্তী পরিস্থিতি

স্বার্থের দ্বন্দ্বে খান খান হবে জাতীয় পার্টি

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বাংলাদেশের সাবেক সামরিক শাসক ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর নানা রকম জটিলতায় ও বিশৃঙ্খলায় তার দলে ভাঙন দেখা দিতে পারে স্বার্থের দ্বন্দ্ব। যার পরিণতি হতে পারে দলটির বিলোপ সাধন। এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব’ রয়েছে। আর দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ‘গণতন্ত্রের অভাব’ আছে। এই পটভূমিতে জেনারেল এরশাদের অনুপস্থিতি জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, এমন প্রশ্ন করা হয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদকে। বিবিসিকে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি। এটি ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। জাতীয় পার্টি সুবিধাবাদের রাজনীতি করেছে। যার কারণে একসময় ক্ষমতা ভোগ করেছে, একসময় ছিটকে পড়েছে ক্ষমতার বলয় থেকে। আবার সমন্বয় করে ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে ঢুকেছিল। কিন্তু এ সবকিছুই এরশাদকে কেন্দ্র করে ছিল। এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। দলে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি ধারা রয়েছে। আরেকটি ধারা জি এম কাদেরকে কেন্দ্র করে। এ দুটি ধারার একটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে যাবে, আরেকটি অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ ফোরামে বা বিএনপি জোটের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। পারসোনালিটি কাল্ট বা ব্যক্তি জনপ্রিয়তা এ দেশের রাজনীতির একটা বড় অংশ, যা জেনারেল এরশাদের মধ্যেও ছিল। কিন্তু এ ধরনের আরো অনেক দল যেমন, মওলানা ভাসানী কিংবা এ কে ফজলুল হকের মতো ক্ষমতাশালী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের দলগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এরশাদের জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এমন হওয়ার খুব সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, এই দলের কোনো জনভিত্তি নেই, আদর্শিক ভিত্তি নেই, কোন ভবিষ্যৎ কমিটমেন্ট নেই। এ কারণে মওলানা ভাসানী ও শেরে বাংলার দলের মতো জাতীয় পার্টিও বিলুপ্ত হতে পারে বলে আমার ধারণা। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা বাম দলগুলো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতবাদের ভিত্তিতে কাজ করে। রাজনীতিতে দলগত আদর্শিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পার্টি কীভাবে এত দিন টিকে ছিলÑ এমন প্রশ্নে এই রাজনীতি বিশ্লেষক বলেন, টিকে ছিল ক্ষমতার অনেক স্বাদ ও সুবিধার কারণে। গণআন্দোলনে স্বৈরাচারের পতনের পর একজন স্বৈরাচারী শাসক রাজনীতিতে টিকে থাকে না। কিন্তু এরশাদ টিকে ছিলেন শুধু তার রংপুর রাজনীতিকে ভিত্তি করে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘গণঅভুত্থানে পতনের পর, জেলখানায় থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে রংপুরের পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেছিলেন এরশাদ। এরপর থেকে রংপুরকে ভিত্তি করে একটি আঞ্চলিক দল হিসেবে পার্লামেন্টারি ডেমোক্র্যাসিতে ১৫ থেকে ২০ আসন পেলে একটা বার্গেনিং পজিশন থাকে। এরশাদ সেটাকে কাজে লাগিয়েছেন।

১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করে প্রায় ৯ বছর দেশ শাসনের পর ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করেন। কিন্তু তারপরও জাতীয় পার্টি বিস্ময়করভাবে ক্ষমতার রাজনীতির শরিক হিসাবে ফিরে আসে। ক্ষমতা হারানোর পর থেকে এরশাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ভূমিকাই বেশি ছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব দলের কারণেই রাজনীতিতে টিকে গেছেন জেনারেল এরশাদ। এরশাদ রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারত না যদি এই বড় দুই দল এরশাদকে নিয়ে টানাটানি না করতো। এ কাজ আওয়ামী লীগও করেছে বিএনপিও করেছে। পার্লামেন্টোরি ডেমোক্র্যাসির মধ্যে অঞ্চল ভিত্তিতে জাতীয় পার্টির একটা প্রভাব ছিল। একটা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ছিল। জাতীয় পার্টিকে প্রথমে ব্যবহার করতে চেয়েছে বিএনপি, এরপর আওয়ামী লীগ দলটিকে জোটসঙ্গী করেছে। এই এরশাদ তোষণের কারণে তিনি এমন অবস্থানে চলে আসেন যে, খুব দুর্বল অবস্থানে থেকেও সবলভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে দর কষাকষি করতে পেরেছে। মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, সংসদে এমপি পেয়েছেন। এখন এ সুযোগ কমে যাবে দলটির জন্য। ফলে এ দলের নেতারা এক থাকতে পারবেন না। নেতারা যার যার মতো স্বার্থের সমীকরণ মিলাতে গিয়ে জাতীয় পার্টির শৃঙ্খলাকে কোনো হুমকির মধ্যে ফেলে দেবেন। পরিণতিতে দলটির ঠিকা থাকা সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে।

 

"