বিনিয়োগের পরও বড় লোকসান!

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত ১০ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে উন্নয়নের জন্য খরচ করেছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের সঙ্গে বাড়ছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে লোকসানের পরিমাণও। বিনিয়োগ যেমন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে, তেমনি লোকসানেরও রেকর্ড করেছে রেল। পাঁচ বছরে লোকসানের পরিমাণ ৬ হাজার কোটি টাকা। শুধু গত অর্থবছরেরই লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। বিপুল অর্থ উন্নয়নে খরচ করেও লোকসানের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজন বিবেচনা না করে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অর্থ খরচের অযোগ্যতা সর্বোপরি দক্ষ জনশক্তির অভাবে মিলছে না সুফল। তারা বলছেন, এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় প্রকল্প বগি, ইঞ্জিন, লাইনসহ যাত্রী চাহিদার কথা বিবেচনা না করে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকেই ঝোঁক বেশি রেলের। এদিকে ১ হাজার ৮৭১ একর জমি খুঁজে পাচ্ছে না রেলওয়ে। এই জমি বেহাত হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সূত্র। সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রয়োজনীয় খাতগুলোতে

বিনিয়োগ করে লাভের কথা চিন্তা করা হয়নি এ খাতে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থ খরচের অযোগ্যতা সর্বোপরি দক্ষ জনশক্তির অভাবে কাজে আসছে না বিনিয়োগ এমন মন্তব্য করে যাত্রীসেবা ও পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক ও রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক তাফাজ্জল হোসেনের। রেলওয়ে বলছে, গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে এ অবস্থা। তবে এর সুবিধা পেতে সময় লাগবে আরো।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জল হোসেন বলেন, যে প্রকল্পগুলো রেকমেন্ডেড আছে সেগুলো বাস্তবায়িত হলেই রেলওয়ের নেটওয়ার্ক সারা দেশে পৌঁছাবে। এই মুহূর্তে চলমান রয়েছে ৪৮টি উন্নয়ন প্রকল্প, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এবার বাজেটে ১৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়েকে। শুধু অর্থ খরচের জন্য প্রকল্প নয়, বরং লোকসানের কারণ অনুসন্ধান করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।

বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের রেকর্ডে থাকা জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৮৬০ একর। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৭১ একর জমি খুঁজে পাচ্ছে না সংস্থাটি। এসব জমির কোনো নথি রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগেও নেই। মূলত নথি না থাকার কারণেই জমিগুলো চিহ্নিত করে উদ্ধার করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

২০০৭ সালে জমিজমা আধুনিক পদ্ধতিতে জরিপ করে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ওই বছরই আধুনিক পদ্ধতিতে জমির জরিপ করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শেলটেক কনসালট্যান্ট প্রাইভেট লিমিটেডকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কাজটি করে দেওয়ার জন্য শেলটেকের সঙ্গে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকার চুক্তি করে রেলওয়ে। ২৪ মাসের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা থাকলেও ২০১৪ সালে এসে জরিপ চূড়ান্ত করে তারা। এখন পর্যন্ত রেলওয়ের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি শেলটেক। তবে জরিপ জমির একটি সারসংক্ষেপ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তারা।

শেলটেকের জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ সালের রেকর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৬০৬ একর। কিন্তু এর মধ্যে জরিপ করে তারা জমি খুঁজে পেয়েছে ৫৯ হাজার ৭৫৫ একর। ১ হাজার ৮৭১ একর জমির কোনো তথ্য শেলটেক বের করতে পারেনি। এর মধ্যে পূর্বাচল রেলওয়েতে খোঁজ মিলছে না ৪৪৭ একর জমি। বাকি ১ হাজার ৪১৪ একর জমি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যার সিংহভাগই লালমনিরহাট এলাকায়। ২০১১-১২ সালে জরিপটি পরিচালনা করে শেলটেক। অন্যদিকে ২০১৮ সালের রেকর্ড অনুযায়ী, রেলের জমি বৃদ্ধি পেয়েছে আরো ২৫৪ একর। সব মিলিয়ে জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৮৬০ একর।

অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নথি গায়েব করে একটি অসাধু চক্র বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছে। এজন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কমলাপুরের ভূমি অফিসে একাধিকবার আগুন লাগার ঘটনাকে। এর বাইরে রেল কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মালিকানা বিরোধ সম্পর্কিত একাধিক মামলায় রেলওয়ে হেরে গেছে বলে অভিযোগ মিলেছে। আবার কোথাও কোথাও রেলওয়ের গাফিলতিতে সংস্থাটির জমি চলে গেছে ব্যক্তিমালিকানায়।

দীর্ঘদিন ধরে রেলের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান। তার অভিযোগ, রেলের জমি জোরজবরদস্তি করে দখল করে নেওয়া হয়েছে। আর এটা হয়েছে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে। তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে কমলাপুরের ভূমি অফিসে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। আর যখনই আগুন লাগে, তখনই গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে যায়। আসলে এটার সঙ্গে বিশাল একটা চক্র কাজ করছে। সম্পত্তি দেখভাল করার জন্য রেলের আলাদা একটা বিভাগই আছে। এ বিভাগ থাকা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ জমি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এমন অভিযোগ মিলছে। এটা কিন্তু সম্পূর্ণভাবে রেলওয়ের ব্যর্থতা। জমিগুলো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনলে রেলের রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় উৎস হতে পারত এসব সম্পত্তি।

 

"