সাকিবই নাম্বার ওয়ান

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

সাহিদ রহমান অরিন

ক্রীড়া সাংবাদিকতা মানেই বোধহয় ক্রীড়াবিদদের সমালোচক রূপে আবির্ভূত হওয়া। আর সেই দিক থেকে ব্রিটিশ মিডিয়া যেন সবাইকে ছাড়িয়ে। সহজে তারা কারো প্রশংসা করে না। ভিনদেশিদের তো নয়ই। আর খুঁত খুঁজে পেলে তো কথাই নেই; বিরামহীনভাবে খেলোয়াড়ের পেছনে লেগে থাকে। অথচ সেই ব্রিটিশ মিডিয়া বিশ্বকাপের মাঝপথে সাকিব-বন্দনায় মেতে উঠেছিল। বাংলাদেশের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে চলতি বিশ্বকাপের অবিসংবাদিত সেরা ক্রিকেটার হিসেবে ঘোষণা করেছিল প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ। সেটা যে তারা এমনি এমনি করেনি, তার প্রমাণ মিলতে পারে আগামীকালই।

আগামীকাল রোববার ঐতিহাসিক লর্ডসে ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ফাইনাল শেষে ঘোষণা করা হবে এবারের আসরের সেরা খেলোয়াড়ের নাম। যে দৌড়ে এখন পর্যন্ত সবার ওপরে আছেন ১৬ কোটির প্রাণ সাকিব আল হাসান। চলতি বিশ্বকাপে ব্যাট ও বল হাতে সাকিব যেভাবে দাপট দেখিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশ সেমিফাইনালের দৌড় থেকে ছিটকে পড়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বিবেচনায় তার ধারেকাছে কেউ নেই।

ক্রিকেট মহাযজ্ঞের দ্বাদশ আসরে উইলোখ- হাতে রানের ফুলঝুরি ছিটিয়েছেন সাকিব। মাত্র ৮ ইনিংসে ৮৬ দশমিক ৫৭ গড়ে করেছেন ৬০৬ রান। চোখ ধাঁধানো দুই শতকের পাশাপাশি ছিল পাঁচটি অর্ধশত রানের ইনিংস। আসরে কেবল একটি ম্যাচেই ৫০-এর নিচে আউট হয়েছেন সাকিব। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন ৪১ রান। তার অনিন্দ্য ব্যাটিংই বলে দেয়, কতটা ধারাবাহিক ছিলেন তিনি। ব্যাটিং পাশাপাশি বল হাতেও কম যাননি সাকিব। ঘূর্ণি জাদুতে ১১ ব্যাটসম্যানকে বোকা বানিয়েছেন বাংলাদেশের সুপারম্যান। যার মধ্যে আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ২৯ রান খরচায় ৫ উইকেট ছিল টুর্নামেন্টের তৃতীয় সেরা বোলিং ফিগার। স্বাভাবিকভাবেই সাকিবের এই পারফরম্যান্সের প্রশংসা করার সক্ষমতা হয়তো দুনিয়ার বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদেরও নেই।

টুর্নামেন্টজুড়ে ব্যাট হাতে যেভাবে সাকিব দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যেভাবে নিজের কাজটা করেছেন কিংবা ফিল্ডিংয়ে সাকিব যেমন ক্ষিপ্রতা দেখিয়েছেনÑ তাতে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কারটা নিঃসন্দেহে তার হাতেই উঠা উচিত বলে মনে করেন ক্রিকেটবোদ্ধারা। কিন্তু সাকিব আটকে গেছেন একটি জায়গাতেই, দল।

বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সাকিব সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেও তার দল বাংলাদেশ অষ্টম স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে। তবুও ফাইনালের আগে ঘুরে-ফিরে প্রশ্ন জাগছে, সাকিবই কি এবারের আসরে সেরা খেলোয়াড় হয়ে যাবেন? এ প্রশ্ন আসাটা সাকিব ছাড়া অন্য যে কারো ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক মনে হতো দলের এমন হতশ্রী পারফরম্যান্সের পর। কিন্তু ব্যাটে বলে এমন অবিশ্বাস্য সাকিবের টুর্নামেন্ট সেরার পথে বাধা হবেন যারা, তারা প্রায় সবাই হয় ব্যাটিং নয়তো বোলিংয়ে ভালো করেছেন। কেউই দুই বিভাগেই সমান পারদর্শিতা দেখাননি। সাকিবের চেয়ে বেশি রান করা দুই ব্যাটসম্যানই বিদায় বলেছেন এবারের বিশ্বকাপকে। ৯ ম্যাচ খেলে সাকিবের চেয়ে ৪২ রান বেশি করা রোহিত শর্মার সংগ্রহ ৬৪৮ আর ওয়ার্নার ১০ ম্যাচ খেলে করেছেন রোহিতের চেয়ে এক রান কম, ৬৪৭। তবে এই দুজনের কারো নেই কোনো উইকেট। যেখানে সাকিবের উইকেট আছে ১১টি। সেই হিসাবে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তাদের চেয়ে এগিয়ে আছেন যোজন-যোজন ব্যবধানে।

সাকিবের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক ১০ ম্যাচ খেলে ২৭ উইকেট পেলেও ৮ ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে করেছেন মাত্র ৬৮ রান। স্টার্কও তাই হিসাবের খাতায় নেই। ওপরের তিনজনই ব্যর্থ হয়েছেন দলকে ফাইনালে তুলতে। কিন্তু টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জিততে সাকিবের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন জো রুট, জেসন রয় ও কেন উইলিয়ামসন। তাদের দল এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে ফাইনালে। ৭ ম্যাচে ৬ ইনিংসে ৭১ দশমিক শূন্য গড়ে ৪২৬ রান করার পাশাপাশি জো রুট পেয়েছেন ২ উইকেটও। অন্যদিকে রয় ৬৮ দশমিক ৬২ গড়ে ৫৪৯ রান করলেও তার ঝুলিতে নেই কোনো উইকেট। এই দুজন তালিকায় আছেন তাদের দল ফাইনালে উঠেছে বলেই। এদিকে, আসরের সর্বাধিক ৯১ দশমিক ৩৩ গড়ে ৫৪৮ রান করেছেন কিউই অধিনায়ক উইলিয়ামসন। ঠা-া মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দলকে জিতিয়েছেন একাধিক ম্যাচ। তবে বল হাতে মাত্র ২ উইকেট পাওয়ায় সাকিবের চেয়ে পিছিয়েই থাকছেন তিনি।

১৯৯২ বিশ্বকাপ থেকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করে আসছে আইসিসি। ইতিহাস বলছে, এ পর্যন্ত যে আটজন আসরের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব জিতেছেন, তাদের দল অন্তত সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। সবাইকে চমকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সাকিব আল হাসান যদি এবার সেই মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন, তবে তিনিই হবেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়; যার দল সেমিতে উঠতে ব্যর্থ হওয়ার পরও নিজে টুর্নামেন্ট সেরার খেতাব জিতবেন। দলীয় নৈপুণ্যে ব্যর্থ হলেও ব্যক্তি সাকিবের এমন সাফল্যে দেশবাসী বুক ফুলিয়ে গর্ব করতেই পারেন।

 

"