নতুন এলাকা প্লাবিত ত্রাণ তৎপরতা শুরু

তিস্তায় রেড অ্যালার্ট

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে, পানি বৃদ্ধির ফলে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র পিয়াইন সারি সাঙ্গু মাতামহুরীর অববাহিকায় লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, সিলেটের গোয়াইনঘাট ও বান্দরবানের আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে ফসলি জমি, পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন, এরই মধ্যে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। এছাড়া টানা বর্ষণে হবিগঞ্জে ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের উখিয়ায় দুই রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টÑ

লালমনিরহাট : তিস্তার প্রবল স্রোতধারায় নদীটির অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি ঘটে চলেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় দোয়ানি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান। এজন্য সেখানে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।

এদিকে, উজানের পানির ঢল সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। ফলে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলার নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে গতকাল শুক্রবার নতুন করে আরো ৩০ হাজার পরিবার বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। হাতীবান্ধার গড্ডিমারী ইউনিয়নের তালেবমোড়ের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বাঁধটি রক্ষায় দুই দিন ধরে রাতভর স্থানীয়রা চেষ্টা চালাচ্ছেন। জনপ্রতিনিধিরা জানান, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা অববাহিকার ২৫টি চর ও গ্রামের মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে।

হাতীবান্ধা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মসিউর রহমান মামুন প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, তার এলাকার ৮ হাজার পরিবারের বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। গড্ডিমারী পুরো ইউনিয়নটি একেবারে তলিয়ে গেছে। হুমকির মুখে সেখানকার রাস্তাগুলো। এলাকাবাসী বালুর বস্তা দিয়ে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

উপজেলার সানিয়াজান ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, চরে প্রায় আড়াই শতাধিক পরিবারে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। বাঁধের ওপর দিয়ে তিস্তার পানি উপছিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। বসত ঘর ও আবাদি জমিগুলো সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হয়েছে। আমনের বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

সিংগিমারী ইউপি চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন দুলু প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, তার ইউনিয়নের দুই সহস্রাধিক পরিবারের বসতবাড়িতে হাঁটু পানি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, তার উপজেলার পানিবন্দিদের তালিকা জেলা অফিসে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে ত্রাণ বরাদ্দ এসেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলী হায়দার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ত্রাণ সহায়তা হিসেবে ৬৮ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার থেকে বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ শুরু করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

কুড়িগ্রাম : ধরলা ব্রহ্মপুত্রসহ কুড়িগ্রামে সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, পাশাপাশি চলছে ভাঙন। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত এবং উপজেলায় তিনটি ইউনিয়নে চলছে নদীভাঙন। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। রৌমারীর বলদমারা ঘাটের দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী বাগুয়ার চরের পাকা রাস্তার প্রায় ৩০০ মিটার ব্রহ্মপুত্রে তলিয়ে গেছে।

পাহাড়ি ঢলে উপজেলার পুরোনো যাদুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাহাড়তলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সদর ইউনিয়নের বড় মাদারটিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশকিছু বিদ্যালয় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

যাদুরচর ইউনিয়নের কর্তিমারি এলাকার ধনারচর নতুন গ্রামের বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ বাঁধ ভেঙে গেলে ওই এলাকা প্লাবিত হয়ে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হওয়ার পাশাপাশি রৌমারী-ঢাকা মহাসড়ক ঝুঁকিতে পড়বে বলে জানান স্থানীয়রা।

এদিকে গতকাল শুক্রবার দুপুরে বন্দবের ইউনিয়নের বাগুয়ার চর এলাকায় নদীভাঙনে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৫০টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

গতকাল শুক্রবার রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপঙ্কর রায় জানান, তারা জরুরিভাবে মোট ৫০টি পরিবার সরিয়ে নিচ্ছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রৌমারীতে বেশকিছু এলাকা নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।

গোয়াইনঘাট (সিলেট) : সিলেটের গোয়াইনঘাটের পিয়াইন ও সারী নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার সবগুলো ইউনিয়নেই পানি বেড়ে গিয়ে অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

গতকাল শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত উপজেলার পূর্ব জাফলং, পশ্চিম জাফলং, আলীরগাঁও, রুস্তমপুর, ডৌবাড়ী, লেঙ্গুড়া, তোয়াকুল ও নন্দীরগাঁও ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে করে গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের সঙ্গে যুক্ত রাস্তাঘাটও তলিয়ে গেছে। বিপাকে রয়েছেন কয়েক হাজার পানিবন্দি মানুষ। সিলেটের বৃহত্তর দুটি পাথর কোয়ারি বন্ধু রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়ে পাঠদান ব্যাহত রয়েছে।

গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিশ্বজিত কুমার পাল বলেন, ‘উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক দিক মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দুর্গত এলাকার ক্ষয়-ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরে প্রয়োজনীয় আরো ত্রাণ সামগ্রীর জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বার্তা পাঠানো হবে বলে তিনি জানান।

হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জবাসীর দুঃখ জলাবদ্ধতা। হবিগঞ্জে স্বরণকালের সবচেয়ে বড় উচ্ছেদ অভিযানেও কাজ হয়নি। বৃষ্টি হলেই শহরের অলিতে-গলিতে জমে যায় হাঁটু পানি। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই হবিগঞ্জে ভারী বর্ষণে সৃষ্টি জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ চরমে উঠেছে শহরবাসীর।

হবিগঞ্জের ডিসি মাহমুদুল কবীর মুরাদ, পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র মিজানুর রহমান মিজানসহ প্রশানের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। ডিসি মাহমুদুল কবীর মুরাদ অচিরেই জলাবদ্ধতা নিরসনের আশ্বাস দিয়েছেন। আর হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মিজানুর রহমান বলেন একই কথা।

বান্দরবান : টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ি অঞ্চলের জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের সাতকানিয়া বাজালিয়া এলাকার প্রায় আধা কিলোমিটার সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলার সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নৌকায় চলাচল করছেন লোকজন।

শহরের আর্মিপাড়া, ইসলামপুর, উজানীপাড়া, শেরেবাংলা নগর, কাশেমপাড়া, বাস স্টেশন এলাকা, হাফেজ ঘোনাসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে লামা উপজেলার বেশকিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলার সদরের সঙ্গে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম জানান, বন্যা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনসহ সার্বক্ষণিক কাজ করছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। পুরো জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে ১২৬টি।

উখিয়া : কক্সবাজারের উখিয়ায় পাহাড়ি ঢলে সহদোর দুই রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে হাকিমপাড়া ১৪নং রোহিঙ্গা শিবির থেকে পাহাড়ি ঢলে ভাসমান অবস্থায় লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা হলো উখিয়ার ১৪নং হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা শিবরের ১৬ ব্লকের আবদুস সালামের ছেলে আনোয়ার সাদেক (৭) ও আনোয়ার ফয়সাল (৬)।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘটসহ সব কটি নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কন্ট্রোলরুম জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বালাসীঘাট পয়েন্টে ৪৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ঘাঘট নদীর পানি ঘাঘট ব্রিজ পয়েন্টে ৪৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং তিস্তার পানি সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

চরাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। ফজলুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হানিফ প্রামাণিক তার ইউনিয়নের নদীভাঙনের শিকার ১৫০টি পরিবারকে ত্রাণ-সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেই সঙ্গে ভাঙনও দেখা দিয়েছে। উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের চকরহিমাপুর, তরফমনু, শাকপালাসহ রাখালবুরুজ, দরবস্ত, হরিরামপুর, মহিমাগঞ্জ ও শালমারা ইউপির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যই চক রহিমাপুর এলাকায় বাঁধের সøুইসগেটটি নদীতে বিলীন হয়েছে। বেশ কিছু বসতবাড়িসহ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।

ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) : সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় আকস্মিক বন্যায় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ পুরোপুরো পানি বন্দি রয়েছে। উপজেলার বেশির ভাগ গ্রামীণ সড়কগুলোই এখন পানির নিচে। উপজেলার ১৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম গত বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতরা আশ্রয় নিলেও এখনো তাদের জন্য সরকারিভাবে কোনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের মধ্যে শিগগিরই ত্রাণ তৎপরতা শুরু হবে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সর্বদা তৎপর রয়েছে বলে জানান তিনি।

 

"