ওআইসির অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

মুসলমানদের নিয়ে কেউ যেন খেলতে না পারে

* ইসলামী পর্যটনকে বিশ্বব্র্যান্ড করার আহ্বান * ভিসা সহজ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলামী পর্যটনকে বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড হিসেবে বিকশিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামী পর্যটনকে ‘বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তুলতে সার্বিক প্রয়াস ও রোডম্যাপের প্রয়োজন অতি জরুরি। আমি মনে করি মুসলিম উম্মাহর একসঙ্গে কাজ করা একান্ত প্রয়োজন। যাতে আমরা বিশ্বের সবার সঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে চলতে পারি। নিজেদের যেকোনো সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারি। যাতে করে অন্য কেউ মুসলমানদের ভাগ্য নিয়ে খেলতে না পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ঢাকা দ্য ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯’ উদ্যাপন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন তিনি। এ সময় পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভিসা সহজ ও এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোরও তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মুসলিম পর্যটক এবং পাশ্চাত্য দেশগুলোর জন্য বিশ্বের সববৃহৎ বালুময় সমুদ্রতট কক্সবাজারে পৃথক পর্যটন স্পট তৈরির প্রস্তাব করেন। তিনি বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী দেশগুলো নিয়ে বাংলাদেশের একটি নৌ ট্যুরিজম রুট তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ‘ইসলামী অর্থনীতি’ সম্পর্কে বলেন, এটি বর্তমানে নবরূপে বিকাশ লাভ করছে। হালাল ফুডস, ইসলামী ফাইন্যান্স, হালাল ফার্মাসিউটিক্যালস এবং প্রসাধনী, হালাল পর্যটন ইত্যাদি হচ্ছে ইসলামিক অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান খাত। এ খাতগুলো বিকাশের জন্য ওআইসি সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্ব একান্ত প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা ওআইসি পর্যটন নগরী ২০১৯-এর মহাউদ্যাপন আন্তঃওআইসি পর্যটক প্রবাহ বৃদ্ধি এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন দ্বারউন্মোচন করবে। যা সংস্থাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের সুযোগ উন্মোচন ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয় বিষয়টি মক্কা মোকাররমায় গত ৩১ মে অনুষ্ঠিত ওআইসির ১৪তম সম্মেলনে গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকৃত হয়। মক্কা ঘোষণায় ওআইসি রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যৌথ ইসলামী কর্মপন্থা গ্রহণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়।

তিনি বলেন, এর আগে ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসি সদস্যভুক্ত পর্যটনমন্ত্রীদের দশম সম্মেলনে গৃহীত ঢাকা ঘোষণায় আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়, সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ইসলামী পর্যটন জনপ্রিয় করার গুরুত্ব স্বীকার করা হয়। একইসঙ্গে পর্যটন খাতে দক্ষতা, উন্নয়ন ও সার্টিফিকেশনের জন্য একটি ইনস্টিটিউট স্থাপনের গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়।

তার সরকারের সময়ে সারা দেশের অবকাঠামো ও যোগাযোগ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। সেইসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল নির্মাণ ও অন্যান্য পর্যটন সুবিধাও থাকবে। জিডিপি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ ডলারে উন্নীত, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন লাভের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পাদপীঠ হিসেবে ঢাকার ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মাসব্যাপী বইমেলা আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বাংলা বর্ষের প্রথম দিন ‘নববর্ষ’ জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির জাতীয় উৎসব হিসেবে উদ্যাপিত হয়। একইসঙ্গে সুস্বাদু খাবার এবং আতিথেয়তার জন্যও ঢাকার সুনাম রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের শুরুতে ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার শহর ঢাকায় ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের আগমনের জন্য তাদের প্রতি শুভেচ্ছা জানান এবং ২০১৯ সালের জন্য ওআইসি সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর পর্যটন নগরী হিসেবে ঢাকাকে নির্বাচিত করায় কৃতজ্ঞতা এবং আনন্দ প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আর এ এম ওবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী, মন্ত্রণালয়টির সচিব এম মহিবুল হক এবং ওআইসির সহকারী মহাসচিব মুসা কুলাকলিকায়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে ৪০০ বছরের প্রাচীন নগরী ঢাকার মুসলিম ঐতিহ্য ও নিদর্শন নিয়ে একটি অডিও ভিজুয়াল পেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দফতর ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রী ও উপদেষ্টাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনার, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং অনুষ্ঠানে যোগদানকারী প্রায় ৩০টি দেশের পর্যটনমন্ত্রী ও তাদের প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে ছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায় ওআইসির পর্যটনমন্ত্রীদের দশম সম্মেলনে গৃহীত ঢাকা ঘোষণায় ঢাকাকে ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ৪ ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শীর্ষস্থান দখল করে ঢাকা। সম্মেলনে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজারবাইজানের ‘গাবালা’কে ২০২০ সালের সিটি অব ট্যুরিজম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকাকে সিটি অব টুরি‌্যজম ঘোষণাকে উদ্যাপনের জন্য আজ বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুসলিম নিদর্শনগুলো পরিদর্শন, কনসার্ট এবং হাতিরঝিলে লেজার শো এবং আতশবাজির প্রদর্শন করা হবে।

ওআইসির ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে মুসলিম ট্যুরিস্টের সংখ্যা ১৫৬ মিলিয়ন যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়াবে ১৮০ মিলিয়ন। একই বছর সারা বিশ্বের জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ হবে মুসলিম।

"