বাড়ছে বিভিন্ন নদীর পানি ডুবছে গ্রাম-ফসলি জমি

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ফেনীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ১২ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, সুনামগঞ্জে সুরমা নদী বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে তিস্তা ধরলা দুধকুমার ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ডুবছে ফসলি মাঠ ও গ্রাম। এছাড়া সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে যমুনার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ভাঙন। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টÑ

ফেনী : ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের ১০টি স্থান ভেঙে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় অন্তত ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন বলেন, গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের কমপক্ষে ১০টি স্থান ভেঙে গেছে। ফুলগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল আলীম জানান, মুহুরী নদীর ফুলগাজী বাজার গার্ড ওয়াল তলিয়ে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার রাতে বাজারের দোকানপাট পানিতে তলিয়ে যায়। বুধবার সকালে বাজার থেকে পানি নেমে গেলেও উপজেলার নি¤œাঞ্চল তলিয়ে গেছে। ফুলগাজীর উত্তর ও দক্ষিণ দৌলতপুর, বরইয়া ও জয়পুর গ্রাম অংশে মুহুরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, পুকুর প্লাবিত হয়েছে। এদিকে পরশুরাম উপজেলার অন্তত ছয়টি অংশে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রাসেলুল কাদের জানিয়েছেন। প্রকৌশলী জহির বলেন, বুধবার সকাল পর্যন্ত মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে বিভিন্ন গ্রামে মাইকিং করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ : পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বক্কর ছিদ্দিকী ভূইয়া জানান, গতকাল বুধবার সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৫১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবু বক্কর বলেন, ‘এসব নদীর পানি জেলার সদর, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুরের প্রায় শতাধিক গ্রামে ঢুকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ।’

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল আহাদ জানান, ৩৭৩৫ প্যাকেট শুকনা খাবার মজুদ রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে থাকারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাট : টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা এবং ধরলা নদীর পানি বেড়ে গিয়ে চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে লালমনিরহাটের প্রায় ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গতকাল বুধবার সকাল ৯টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।

বন্যায় জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলার নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের তিস্তা চরাঞ্চলের পাসাইটারী গ্রামের মানিক মিয়া, আজিজুল ইসলাম ও আমিনুর রহমান জানান, তারা দুই দিন ধরে পানিবন্দি রয়েছেন। সিন্দুর্না ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে এ ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গোবর্দ্ধন চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজী শফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি উঠায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, পানিবন্দি হয়েছে এমন কোনো খবর জানা নেই। শুধুমাত্র সদরের খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের ৩০-৩৫টি পরিবার জলাবদ্ধতায় রয়েছেন।

কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) : যমুনায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে শুরু হয়েছে ব্যাপক নদীভাঙন। কাজীপুর সদর ইউনিয়নের পাটাগ্রাম সিলিডস্পারে ভাঙন দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন গান্ধাইল ইউনিয়নের বাঐখোলা, পাটাগ্রাম, সিংড়াবাড়ী ও শুভগাছা ইউনিয়নের বাসিন্দা।

সরেজমিনে জানা যায়, প্রায় এক মাস ধরে যমুনা নদীতে কাজীপুর পয়েন্টে হঠাৎ করেই পাটাগ্রাম ও সিংড়াবাড়ী এলাকায় ব্যাপকভাবে ভাঙন দেখা যায়। পাটাগ্রাম সলিডস্পারের ভাটিতে ও উজানে ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে স্পারের দুই পাশের গোড়ার মাটি প্রায় ২০০ মিটার ধসে গেছে। এর মধ্যে সিংড়াবাড়ী সলিডস্পারটি ধসে গেছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি ঘরবাড়ি। গত একমাসে প্রায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। এর মধ্যে ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে চোরমারা, ঝুমকাইল, তারাকান্দি, বারাবাড়ি, টেংলাহাটা, দোয়েল, বাঘগাড়ী, পাটাগ্রাম, পূর্ব খুকশিয়া, খাস খুকশিয়া, প্রজারপাড়া, বেতগাতী, চর সিংড়াবাড়ী, ভুরুঙ্গী, কান্ত নগর, শুভগাছাসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে কিছু বালির জিও ব্যাগ ফেলেছি। ভাঙন ঠেকাতে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। আগামী দু-তিন দিন এই পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, কুড়িগ্রামের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে (ফেরিঘাট পয়েন্ট) ৫০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পয়েছে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ৩৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামে ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা জানান, ধরলার তীরবর্তী নি¤œাঞ্চলের পাট, পটোল ও বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসল ডুবে গেছে।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে তার ইউনিয়নের পোড়ারচর, ঝুনকারচর, পশ্চিম ভগবতীপুর, চর পার্বতীপুর, কালীর আলগা ও খেওয়ার আলগারসহ বেশকিছু নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আগামী দু-তিন দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘২০১৭ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো আমরা সংস্কার করেছি। ধরলার বাম তীরে কিছু বাঁধ সামান্য ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে তবে সেগুলো আমরা মেরামতের ব্যবস্থা নিয়েছি।’

 

 

"