সর্বজনীন পেনশন নীতিমালা চলতি মাসেই

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

শাহজাহান সাজু

সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনের আওতায় আনতে নীতিমালার খসড়া প্রণয়নে কাজ শুরু করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সর্বজনীন পেনশন নীতিমালার খসড়া রূপরেখা তৈরির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আজিজুল আলমের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি কাজ করছে। চলতি মাসেই কমিটি এ সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালা অর্থ সচিবের কাছে জমা দেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা যায়, বর্তমানে কেবল সরকারি চাকরিজীবীরাই পেনশন সুবিধার আওতায় রয়েছেন। তবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু হলে এর বাইরে বেসরকারি খাতে নিয়োজিত কর্মীরাও পেনশনের আওতায় আসবেন। পেনশনের আওতায় থাকা প্রত্যেকের আলাদা পরিচিতি নাম্বার থাকবে। কর্মী তার আয় থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেনশন তহবিলে জমা দেবেন। এতে অর্থ দেবেন নিয়োগদাতাও। সরকার ওই অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করবে। বিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ থেকে পেনশনধারীকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে। সূত্র জানায়, এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত হলে প্রথমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এর আওতায় আনা হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষকে এই পেনশনের আওতায় আনা হবে। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় বেসরকারি পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে বড় বড় করপোরেট হাউস, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে কর্মরত চাকরিজীবীদের আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো আনা হবে। তবে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে।

জানা গেছে, দেশের প্রায় ৬ কোটি কর্মজীবীর মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখই কাজ করেন বেসরকারি খাতে। এসব কর্মজীবীকে শেষ বয়সে সুবিধা দিতে চলতি বাজেটে দেওয়া হয়েছে সবার জন্য পেনশন বা সর্বজনীন পেনশনের প্রতিশ্রুতি। ২০১৯-২০ বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, “সরকারি পেনশনাররা দেশের পুরো জনগণের একটি ভগ্নাংশ মাত্র। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতসহ দেশের সব জনগণের জন্য একটি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে চালুর লক্ষ্যে একটি ‘ইউনিভার্সাল পেনশন অথরিটি’ শিগগিরই গঠন করা হবে।”

জানা যায়, সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি ২০০৪ সালে সীমিত আকারে চালু করেছিল ভারত সরকার। কলকাতা ও আসাম ছাড়া বাকি সব রাজ্যে এই ব্যবস্থা বর্তমানে চালু রয়েছে। নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা এই বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।

জানা যায়, এর আগেও এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার ওপর একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় পেনশন তহবিল হবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। অর্থাৎ চাকরিজীবী ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এই তহবিলে অর্থ দেবে। এর পরিমাণ হতে পারে চাকরিজীবীর মূল বেতনের ১০ শতাংশ। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষও সমপরিমাণ অর্থ দেবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে একই নিয়মে তহবিল গঠন করা হবে। পেনশনের এই তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি রেগুলেটরি অথরিটি থাকবে। ওই অথরিটির মাধ্যমে পেনশন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রস্তাবিত পেনশন স্কিমের আওতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বয়স হবে ৬০ বছর। বেসরকারি খাতের জন্য ৬৫ বছর। নির্ধারিত সময়ে চাকরি শেষে অর্ধেক পেনশনের টাকা এককালীন তোলা যাবে। বাকি টাকা তহবিলে থাকবে। ওই অর্থ পরে প্রতি মাসে ধাপে ধাপে উঠানো যাবে। তহবিল পরিচালনার জন্য আলাদা রেগুলেটরি অথরিটি গঠন করা হবে। তারা লাভজনক খাতে তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করবেন। এমনকি বিনিয়োগ সুরক্ষাও দেওয়া হবে। এই বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা আসবে, তার অংশ মাসে মাসে পাবেন সুবিধাভোগীরা। পেনশনভোগীদের স্মার্টকার্ড দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত পেনশন স্কিমে ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সুবিধা থাকবে।

জানা যায়, এমন উপলব্ধি থেকেই গত কয়েক বছর ধরে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সর্বশেষ গত বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত সব কর্মজীবী মানুষের জন্য একটি টেকসই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের কাজ এ অর্থবছরেই শুরু করার আশা রাখি। দেশের মোট বয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে পেনশনভোগীর সংখ্যা অতি সামান্য। শুধু সরকারি কর্মচারী এবং কিছু বেসরকারি সংস্থার ৭ থেকে ৮ লাখ পরিবার বর্তমানে নিয়মিত পেনশন পেয়ে থাকেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করার জন্য কাঠামোগত সংস্কার দরকার যা সময়সাপেক্ষ।

 

 

"