পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম

ভারী বর্ষণ অব্যাহত আরো বৃষ্টিপাতের পূর্ভাবাস

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম শহরের বিরাট একটি অংশ রয়েছে বড় ধরনের পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে। চার দিন ধরে থেমে থেমে টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের যে অংশ কাটা রয়েছে, তা দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসছে। শহরের নাসিরাবাদ এলাকা থেকে সীতাকু- ও হাটহাজারী এলাকা পর্যন্ত পাহাড়ের বড় অংশ খ--খ-ভাবে কাটা হয়েছে।

পাহাড়ের ভেতর ঘরবাড়ি করে এখনো বাস করছে হাজারো পরিবার। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য মতে, পাহাড়ের ভেতর বাস করছে ৮৩৫ পরিবার। কিন্তু বাস্তবচিত্র অন্যরকম। পাহাড়ের ভেতর বাস করা পরিবারের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। মাঝে মাঝে ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে কাছের পাহাড়ে অবস্থানকারীদের উচ্ছেদ করলেও বড় অংশ রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারণ এসব পাহাড়ে বাস করা ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর ধরে সরকারি খাস জায়গার পাহাড়ের বড় অংশই অবৈধ দখলে নিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ করছে।

চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। যাদের আনা হবে, তাদের থাকার জন্য আটটি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, বৃষ্টিপাত থামতে আরো সময় লাগবে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন নগরীতে বেশ কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। সূত্র জানায়, নগরীর পাহাড়তলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নগরীর আকবর শাহ ও পাহাড়তলী এলাকার পাহাড়ের বাসিন্দারা, ফিরোজ শাহ-ই ব্লক স্কুলে কৈবল্যধাম, লেকসিটি, ফয়সলেক এলাকার বাসিন্দারা; চট্টগ্রাম মডেল হাইস্কুলে মধুশাহ পাহাড় ও পলিটেকনিকাল সংলগ্ন পাহাড়ে বসবাসকারীদের জন্য, জালালাবাদ বাজার সংলগ্ন শেডে এ এলাকার পাহাড়ে বসবাসকারীরা; আল-হেরা ইসলামিয়া মাদ্রাসায় লালখান বাজার-সংলগ্ন ট্যাংকির পাহাড়ের বাসিন্দারা থাকবনে। এ ছাড়া লালখান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রৌফাবাদ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পোড়া কলোনি-সংলগ্ন ছৈয়দাবাদ স্কুলকেও আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, নগরীর ১৩টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পরিবার বাস করছে। গত কয়েক বছরে পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে মারা গেছে অন্তত ২০০ জন। ২০০৭ সালের ১১ জুনে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধস ট্র্যাজেডিতে ১২৭ জন মারা যায়। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখান বাজার মতিঝরনা এলাকায় পাহাড়ধসে নিহত হয় ১১ জন। ২০১১ সালে নগরীর বাটালী হিলে পাহাড়ধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ২০১২ সালের ১ জুলাই নগরীর বাটালী হিল পাহাড়ের প্রতিরক্ষা দেয়ালধসে প্রাণ হারায় ১৭ জনসহ নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় চাপায় মারা যান ২৪ জন। ২০১৭ সালের ১২ ও ১৪ জুন পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে ৩৭ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে চট্টগ্রামে যেভাবে ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়ধসের সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসককে পাঠানো এ বার্তায় পাহাড়ধস রোধে আটটি নির্দেশনা দিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে, আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে বসবাসকারীদের অন্যত্র আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে অন্যত্র আবাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পাহাড়ে নতুন করে বসতি ও ব্যবসায়িক স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ, অননুমোদিত পাহাড় কাটা বন্ধ ও ন্যাড়া পাহাড়ে গভীর শেকড়যুক্ত গাছ লাগানো হবে। যেসব পাহাড়ের পাদদেশের ঢালু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী গাইডওয়াল, পানি নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর তৈরি করা, পাহাড় কাটা ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে যেকোনো মূল্যে পাহাড় কাটা বন্ধ করা, পাহাড় কাটার কুফল সম্পর্কে পাহাড়ি এলাকার জনগণকে সচেতন করা, পাহাড় কাটাবিষয়ক মামলা, তদন্ত ও বিচার সুষ্ঠু এবং দ্রুততর করার জন্য পরিবেশ অধিদফতরকে অবগত করা।

বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের কাছে জমা দেওয়া জেলা প্রশাসকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাহাড়ধসে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দুর্বৃত্তায়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। বিরাজমান সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে যেকোনো মূল্যে পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব পরিবারে আছে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংযোগসহ বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সুবিধা।

এতে আরো বলা হয়েছে, পাহাড়ধসে ভৌগোলিক কারণ কিছুটা দায়ী হলেও এর চেয়ে বড় দায়ী নির্বিচারে পাহাড় কাটা, পাহাড় ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা না থাকা, পাহাড় নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির অনুপস্থিতি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দুর্বৃত্তায়ন। তবে এসব ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী।

প্রতিবেদনে অবৈধভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীরা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়, অবৈধ উপায়ে পাহাড়ে বসবাসকারীরা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়সহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ তথা মাদকসেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। এ কারণে একটি সামাজিক সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। তা ছাড়া পাহাড়ে বসবাসকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। এক শ্রেণির প্রভাবশালী দালাল চক্র দেশের আইনশৃঙ্খলাকে অমান্য করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এসব পাহাড়কে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে ভাড়া দেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড় কাটার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রামের বেশ কিছু পাহাড়। এর মধ্যে জেলা প্রশাসন যেসব পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হচ্ছেÑ টাইগারপাস মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের পাহাড়, সিআরবির পাদদেশ, টাইগার পাস-লালখান বাজার রোডসংলগ্ন পাহাড়, রেলওয়ে এমপ্লয়িজ গার্লস স্কুলসংলগ্ন পাহাড় ও আকবর শাহ আবাসিক এলাকাসংলগ্ন পাহাড়। সড়ক ও জনপথ, রেলওয়ে, গণপূর্ত ও ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝরনা ও বাটালি হিলসংলগ্ন পাহাড়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মালিকাধীন পরিবেশ অধিদফতর-সংলগ্ন পাহাড় ও লেক সিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়ও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকায় রয়েছে।

বাকি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো হচ্ছেÑ বন বিভাগের বন গবেষণাগার ও বন গবেষণা ইনস্টিটিউটসংলগ্ন পাহাড়। ইস্পাহানি গ্রুপের ইস্পাহানি পাহাড়। জেলা প্রশাসনের ডিসি হিলের চেরাগী পাহাড় মোড়সংলগ্ন পাহাড়, একে খান কোম্পানির এ কে খান কোম্পানি পাহাড়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কৈবল্যধামস্থ বিশ্ব কলোনির পাহাড়, ভিপি লিজভুক্ত লালখান বাজার, চান্দমারি রোডসংলগ্ন জামেয়াতুল উলুম ইসলামী মাদরাসাসংলগ্ন পাহাড়, সরকারি (এপি সম্পত্তি) নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা-সংলগ্ন পাহাড়। চট্টগ্রামে পাহাড় দখলের প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নাম সর্বস্ব সংগঠন পর্যন্ত। দখলদারদের তালিকায় রয়েছেন জনপ্রতিনিধিও। বাদ যাননি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার একর পাহাড় দখলের পর তা কেটে পরিণত করা হয়েছে সমতল ভূমিতে।

সীতাকু-ে পাহাড় কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা। এমনকি প্লট তৈরি করে বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। এ এলাকায় এরই মধ্যে শত শত একর পাহাড় কেটেছে কথিত ছিন্নমূল নামে একটি সংগঠন। তারা এরই মধ্যে পাহাড় কেটে ছিন্নমূলদের জন্য তৈরি করেছে শত শত বসতবাড়ি। এখনো পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে নদীভাঙা মানুষদের কাছে বিক্রি করা অভিযোগ রয়েছে। পাহাড়ে এই অবৈধ বসতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০০৪ সালে একাধিকপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

২০১০ সালে স্থানীয় লাল বাদশা ও আলী আক্কাসের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ওই এলাকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সংবাদকর্মীরা। ২০১০ সালের ২৩ মে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলী আক্কাস নিহত হন। চলতি বছর জুলাই মাসে জঙ্গল সলিমপুরের বিবিরহাট এলাকায় পাহাড়ধসে তিন শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটার পর এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ায় প্রশাসন। পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালিয়ে ছিন্নমূল বস্তিবাসী নেতা কাজী মশিউর রহমানকে তার বাসা থেকে অস্ত্রসহ ধরে র‌্যাব। ওই বাসা থেকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ মোট ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। কয়েক বছরে সীতাকু-ের শীতলপুর এলাকার অর্ধশতাধিক ছোট ও বড় পাহাড় কেটে তা সমতল ভূমিতে পরিণত করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কারখানা। পাহাড় কাটার উৎসব চলছে উপজেলার কুমিরা, ফৌজদারহাট, বাঁশবাড়িয়া, সুলতানা মন্দির, কদম রসুল, বাড়বকু-, ভাটিয়ারীসহ বিভিন্ন এলাকায়। এসব এলাকায় হাজার হাজার একর পাহাড়ি ভূমি কেটে পরিণত করা হয়েছে সমতল ভূমিতে। এ ছাড়া ইটভাটার নামেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলছে পাহাড় কাটার উৎসব।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন বলেন, পাহাড়ধসে জানমাল রক্ষায় বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি আমরা। প্রাথমিক পর্যায়ে পাহাড় কাটা বন্ধ করা ও পাহাড় থেকে উচ্ছেদের দিকে জোর দিচ্ছি আমরা। এ ছাড়া পাহাড় কাটার কুফল সম্পর্কে পাহাড়ি এলাকার জনগণকে সচেতন করার কাজও চলছে। পরে ন্যাড়া পাহাড়ে গভীর শেকড়যুক্ত গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, সরকারি হিসাবে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৫০০ পাহাড় আছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ঝুঁকিপূর্ণ ২৮টি পাহাড় আছে। এ সব পাহাড়ে ৮৩৫ পরিবার বসবাস করছেন।

 

"