নকশায় পরিবর্তন আসছে

চট্টগ্রাম ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামের উন্নয়নে বর্তমান সরকার গৃহীত বৃহৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বড় প্রকল্প ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পের বন্দর অংশ নিয়ে নকশাগত জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার পর অবশেষে এর মূল নকশায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলীদের দফায় দফায় বৈঠকের পর এর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা হয়েছে। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উভয় সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দরকেন্দ্রিক নগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে বিবেচিত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত শিল্পাঞ্চল ও নির্মীয়মান ইকোনমিক জোনের এ নগরী দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। কোনো ধরনের যানজট ছাড়াই যাতে বিনিয়োগকারী দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যেক্তারা চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে সোজা মূল শহরে ৩০ মিনিটে পৌঁছুতে পারে চট্টগ্রামের উন্নয়নে গৃহীত বড় বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ অন্যতম ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। চট্টগ্রামের তথা দেশের সর্ববৃহৎ সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ের কাজকে মূল নকশা অনুযায়ী ছয়টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের পাশ দিয়ে যাওয়া বারেকবিল্ডিং-সল্টগোলার ২ হাজার ৯০০ মিটার ফ্লাইওভারের চার লেনের অংশ।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম থেকে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে কোনো ধরনের ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি না হয় সে কারণে এই অংশটির ডিজাইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে প্রকল্পের জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে। এর আগে এ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও সিডিএর মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু দেশের সিংহভাগ পণ্য আমদানি-রফতানি হয় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কারণে বন্দরে পণ্যবাহী যান চলাচলে কোনো ধরনের যানজট যাতে সৃষ্টি না হয় সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সিডিএকে বিষয়টি জানানো হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, যেহেতু এটি বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এ বন্দরে আন্তর্জাতিক আইএসপিএস (ইন্টারন্যাশনাল শিপ অ্যান্ড পোর্ট ফেসিলিটি সিকিউরিটি) কোড অনুযায়ী পণ্য চলাচলে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে সে বিষয়ে গুরুত্বআরোপ করা হয়। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসব বিষয় মনিটর করে বন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এসব বিষয়গুলো মেনে চলা হচ্ছে কিনা সেজন্য উভয় পক্ষের আলোচনার পর ফ্লাইওভারের লে-আউট/ডিজাইন বিষয়টি পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়।

প্রকল্প সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্যের (প্রকৌশল) তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালককে অন্তর্ভুক্ত করে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলীকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটি কাজ শুরু করেন। গত সপ্তাহের সর্বশেষ বৈঠকে উভয় সংস্থা মূল নকশা পরিবর্তন করতে উভয় সংস্থা সম্মত হন তবে আরো কয়েক দফা বৈঠকের পর এ নকশা পরিবর্তন চূড়ান্ত করা হবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) কমোডর খন্দকার আকতার হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, দেশের প্রধান আমদানি-রফতানির বন্দর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্যবাহী যান চলাচলে যাতে কোনো ধরনের ট্রাফিক জ্যাম না হয় সেদিকে দৃষ্টি রেখেই আমরা এগোচ্ছি। এজন্য মূল নকশায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএর সঙ্গে বৈঠক করে আমরা এর একটি সুন্দর সমাধানের দিকে বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছি।

অতীতে যানজটের কারণে প্রায়শই এসব শিল্প বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িতরা অনেকেই বিমানের নির্ধারিত ফ্লাইট ধরতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। চট্টগ্রাম শহরের মূল কেন্দ্র থেকে বিমানবন্দরের ১৬ থেকে ১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টায় আটকা পড়তে হয়। চট্টগ্রামে বিমানবন্দরে কোনো ধরনের যানজট ছাড়াই পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকার বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জন্য এ বৃহৎ প্রকল্পটি হাতে নেন। মূলত চট্টগ্রামবাসীর এ সমস্যাটিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় এনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক ইচ্ছায় প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন দেন। সিডিএ এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম শহরের লালখানবাজার হতে শাহ-আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ নামের এ প্রকল্প ২০১৭ সালের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুনে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ম্যাক্স-র‌্যানকেন জয়েন্ট ভেনচারকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, হয়ত আর দুই-একটি মিটিংয়ের পর আমরা মূল নকশাটিতে পরিবর্তন আনব। চট্টগ্রাম বন্দর যেহেতু দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এর কর্মকান্ডে কোনো ধরনের ব্যাঘাত যাতে না ঘটে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে বন্দর অংশের কাজে আমরা হাত দেব।

সিডিএর প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, অন্যান্য অংশের কাজ পুরোদমে চলছে, বর্তমানে সিমেন্ট ক্রসিং থেকে কাঠঘর পর্যন্ত অংশে পাইলিংয়ের কাজ হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৫০টি পাইলিং হয়েছে।

সিডিএর মাধ্যমে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পটির কাজ শহরের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধাপে ভাগ করা হয়েছে। ছয়টি ধাপে বিভক্ত সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ফ্লাইওভারের কাজের অংশগুলো হচ্ছে, লালখানবাজার-দেওয়ানহাট (১ হাজার ৩০০ মিটার চারলেন), দেওয়ানহাট-বারেকবিল্ডিং(২ হাজার মিটার চারলেন মূল ফ্লাইওভার), বারেকবিল্ডিং-সল্টগোলা (২ হাজার ৯০০ মিটার চারলেন মূল ফ্লাইওভার), সল্টগোলা-সিমেন্টক্রসিং (৩ হাজার ১৫০ মিটার চারলেন মূল ফ্লাইওভার), সিমেন্টক্রসিং-কাঠঘর (২ হাজার ১৫০ মিটার চারলেন মূল ফ্লাইওভার), কাঠঘর-ভিআইপি রোড (২ হাজার ৩৫০ মিটার চারলেন মূল ফ্লাইওভার এবং সি-বিচ থেকে ভিআইপি রোড ৮৫০ মিটার দুই লেন ফ্লাইওভার নির্মাণ)।

কবে নাগাদ বন্দর অংশে হাত দেওয়া হবে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী রাফিউল আলম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, খুব শিগগিরই আমরা নকশা পরিবর্তন সংক্রান্ত ব্যাপারে চূড়ান্ত বৈঠক করবো।

 

 

"