পাহাড়ধসে নিহত ২

বৃষ্টিতে ভাসল চট্টগ্রাম নগরী

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

চট্টগ্রাম নগরী ও পার্বত্য তিন জেলায় গতকাল প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। এতে তলিয়ে যায় নগরীর বিভিন্ন রাস্তা। ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েন পথচারী ও যানবাহনের চালকরা। প্রবল বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম ৩৫০ শয্যার হাসপাতালের নিচতলায় প্রায় হাঁটু সমান পানি উঠে যায়। পানির মধ্যেই বিভিন্ন ওয়ার্ডে চলে চিকিৎসাসেবা। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলায় ঘটেছে পাহাড়ধসের ঘটনা। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে শিশুসহ মারা গেছেন দুজন। এছাড়া পাহাড়ধসের কারণে রাঙামাটি ও বান্দরবানের কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম ব্যুরো ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টÑ

চট্টগ্রাম ব্যুরো : কয়েক ঘণ্টার টানা ভারী বর্ষণ ও থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম মহানগরীর অধিকাংশ এলাকা হাঁটু-কোমর পানিতে নিমজ্জিত হয়। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে হাঁটু-কোমর পরিমাণ পানি জমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে দেখা যায় অফিস-আদালত, স্কুল কলেজের পরীক্ষার্থীদের। এছাড়া, প্রায় প্রতিটি অলিগলিতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।

টানা বর্ষণের কারণে নগরীর বহদ্দারহাট এক কিলোমিটার, অক্সিজেন, মুরাদপুর, ষোলশহর ২নং গেট, ওয়াসা মোড়, হামজারবাগ, মোহাম্মদপুর, শুলকবহর, হালিশহর, আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ সংলগ্ন এলাকা, শিশু হাসপাতালের একাংশ, হালিশহর কে ব্লক, প্রবর্তক মোড়, কাপাসগোলা, চকবাজারসহ নগরের কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিতে এসব এলাকায় জমেছে কোমর সমান পানি।

নগরীর বহদ্দারহাট ও আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের ওপর সারি সারি গাড়ি আটকা পড়ে। আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের বহদ্দারহাট অংশ ও বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের মাঝামাঝি স্থানে কোমর সমান পানি জমে যাওয়ায় উভয় ফ্লাইওভারের দুই দিক থেকে আসা সব যানবাহন গতকাল বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দীর্ঘসময় আটকা পড়তে দেখা গেছে। নগরীর ঘাটফরহাদ বেগ এলাকায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সীমানা দেওয়াল ভেঙে পাহাড়ি মাটি ও পানি এসে পড়ে সড়কে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ডিউটি অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহমুদুল আলম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ১৮৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছেন তারা। এ অবস্থা আরো দু’একদিন অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করছে আবহাওয়াবিদরা।

দেয়ালধস : চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর হেমসেন লেন ১নং গলির একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের সীমানা দেয়ালধসে পড়ে। এর ফলে ওই এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবারের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সোমবার সকালে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় এ ঘটনা ঘটে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। গ্রিন ভিউ নামের ভবন মালিক শামীম আহমেদ জানান, নিজস্ব লোকজন দিয়ে হাঁটাচলার পথ পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছি।

বন্দরে মালামাল ওঠানামা স্বাভাবিক : ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশীদ জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বঙ্গোপসাগরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে খাদ্যশস্যসহ বৃষ্টিতে ভিজলে নষ্ট হয় এমন খোলা পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। এছাড়া পাথর জাতীয় কিছু পণ্য দু-চারটি লাইটার জাহাজে খালাস হচ্ছে। তবে বৈরী আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল থাকলে বিদেশি জাহাজের পাইলটরা লাইটারিং বন্ধ করে দিয়েছেন।

বন্দর বিভাগ সূত্র জানায়, এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি বার্থের জাহাজে কনটেইনার হ্যান্ডলিং স্বাভাবিক রয়েছে।

রাঙামাটিতে শিশুসহ নিহত ২ : রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় সোমবার দুপুরে পাহাড়ধসে শিশুসহ দুজন নিহত হয়েছে। তারা হলেন উপজেলার কেপিএম এলাকার সূর্য মল্লিক (৬) ও তাহমিনা আক্তার (২৫)।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রবল বর্ষণে কেপিএম এলাকার কলাবাগানে পাহাড়ের মাটিধসে টিন শেডের ঘরের ওপর পড়ে। কাপ্তাইয়ের ফায়ার সার্ভিসের টিম ঘটনাস্থল থেকে শিশুসহ দুজনকে উদ্ধার করে চন্দ্রঘোনার হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। কাপ্তাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

বান্দরবান : টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণের ফলে বান্দরবানের চিম্বুক সড়কের নয় মাইল এলাকায় পাহাড়ধসের কারণে রুমা ও থানচি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সোমবার প্রবল বর্ষণের সময় ওই এলাকায় সড়কের ওপর একটি বিশাল পাহাড়ধসে পড়লে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে লামা উপজেলার পৌর এলাকাসহ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সচেতনতা সৃষ্টি ও নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য সোমবার জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জেলা শহরের ইসলামপুর, হাফেজ ঘোনা, লাঙ্গীপাড়াসহ পৌর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন।

রাঙামাটিতে যান চলাচল বন্ধ : গত দুই দিনের প্রবল বর্ষণে রাঙামাটির লংগদুতে পাহাড়ধসে সড়কে আঁছড়ে পড়ে। ফলে লংগদু-দিঘীনালা সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সোমবার সকালে উপজেলার বামেছড়া এলাকায় এ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে এর ফলে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বামেছড়া এলাকায় রাস্তার পাশের একটি পাহাড়ের বেশকিছু অংশ ধসে রাস্তার ওপর পড়েছে। এছাড়াও তেঁতুলতলা এবং ডাঙ্গাবাজার এলাকায় সড়কে কোমর সমান পানি উঠেছে। পানি ও পাহাড়ধসের কারণে ঢাকাগামী শান্তি পরিবহনের বাস লংগদু ছেড়ে যেতে পারেনি এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাসও ডাঙ্গাবাজার এলাকায় আটকে পড়েছে।

এদিকে পাহাড়ধসের সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রবীর কুমার রায়। তিনি বলেন, ছোট একটি পাহাড়ধসে সড়কে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টি কিছুটা কমলে সড়ক থেকে মাটি সরানোর কাজ শুরু হবে।

চবিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় মাইকিং : অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) যেকোনো সময় পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে ও কলোনিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার বেলা ১১টা থেকে মাইকিং শুরু হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা অফিসের প্রধান বজল হক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে ও কলোনিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রত্যেকটি কলোনিতে ঝুঁকিতে থাকা ঘরগুলোর সদস্যদের সঙ্গে মিটিং হয়েছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নিরাপদ আশ্রয়স্থানে যাবে বলেছেন।

 

"