সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা ফেরাতে চীনের আশ্বাস পেয়েছি

* দুদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় * উন্নতি চাইলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মেনে নিতে হবে * ধর্ষণ প্রতিরোধে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গা ফেরাতে চীনের আশ্বাস পেয়েছি। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেনÑ রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে তারা কথা বলবেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার বিকেলে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।

সরকারপ্রধান তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, তার চীন সফর দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করে বলেছেন, আমরা পরস্পরের সত্যিকারের বন্ধু হয়ে থাকব। আমরা দুই প্রতিবেশী দেশ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছি।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীনের অবস্থান-সংক্রান্ত প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, তারা বলেছেনÑ বিষয়টি দেখবেন, বিবেচনা করবেন, এটা কি সুখবর মনে হচ্ছে না? চীন সব সময় মনে করছে বিষয়টির দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত। এ জন্য তাদের যা করণীয় তারা তা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনের প্রধানমন্ত্রী আমাকে জানিয়েছেন, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুবার মিয়ানমারে পাঠিয়েছেন। প্রয়োজনে আবার মন্ত্রীকে পাঠাবেন।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়লে আমেরিকার সঙ্গে কোনো সমস্যা হবে কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার দিয়ে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’। আমরা এ নীতি মেনে চলছি। কার সঙ্গে কার দ্বন্দ্ব, তা দেখা আমাদের দরকার নেই। আমার কাজ করার ধরনটা আলাদা। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে চলতে চাই। দেশকে এগিয়ে নিতে কোথা থেকে সাহায্য আসবে, সুবিধা কোথায় পাবÑ সেটাই মূল বিষয়।

চাকরির বয়স ৩৫ না করার পক্ষে যুক্তি : চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন নিয়মিত পড়াশোনা করলে ২৩-২৫ বছরের মধ্যেই সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতে পারে। এ ছাড়া তিনটি বিসিএসে দেখা গেছে, যারা বেশি বয়সি, তাদের পাশের হার খুবই কম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন জন্ম নিবন্ধন হয়। নিয়মিত পড়াশোনা করলে ১৬ বছরে এসএসসি পাস করে। এরপর দুই বছরে এইচএসসি। এরপর চার বছরে অনার্স ও এক বছরে মাস্টার্স করলে ২৩ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতে পারে। এখন আপনারাই বলেন, চাকরির বয়স বাড়ালে কী হবে?

উন্নতি চাইলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মেনে নিতে হবে : গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে সরকারপ্রধান বলেন, দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে, সেটুকু যদি বাড়ানো না হয়, তাহলে আমাদের সামনে দুটি পথ আছেÑ হয় আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যাতে না বাড়ে, সে জন্য এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়ে এনার্জির ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলব। এতে অর্থনীতির উন্নতি হবে না। যদি উন্নতি চান এটাকে মেনে নিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৪-০৫ সালে মিয়ানমারের গ্যাস নিতে ভারত, চীন ও জাপান বিনিয়োগ করেছিল। সেই গ্যাস বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত নিতে চেয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া সেটা হতে দেয়নি। আমি হলে ভারতে গ্যাস নিতে তো দিতাম-ই, আমার ভাগটাও রেখে দিতাম। আসলে নেতৃত্বের ভুল হলে এর খেসারত জনগণকে দিতে হয়।

তিনি বলেন, প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানি করতে খরচ হয় ৬১.১ টাকা। ভারতে গৃহস্থালির জন্য স্থানভেদে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩০-৩৭ টাকা। বাংলাদেশে তা ১২ দশমিক ৬০ টাকা। শিল্পে গ্যাসের দাম ১০ দশমিক ৭০ টাকা, ভারতে এটির দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের গ্যাসের প্রয়োজন আছে কি না? ২০০৮ সাল পর্যন্ত জিডিপি কতটুকু বেড়েছে? গ্যাস আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে। এলএনজি আমদানিতে খরচ বেশি পড়ে। যেটুকু বাড়ানো হয়েছে, সেটি যদি না বাড়ানো হয়, তাহলে এলএনজি আমদানি কমে যাবে।

আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, যারা আন্দোলনের সময় বলছেÑ ভারত কমিয়েছে, ভারতে বছরে দুবার দাম বাড়ানো হয়। এটি তাদের নীতি। পহেলা এপ্রিল এবং অক্টোবরে গিয়ে তারা গ্যাসের দাম অ্যাডজাস্ট করে। অর্থাৎ মূল্যটা বাড়ায়। এলএনজি আমরা ৬১ দশমিক ১২ টাকায় নিয়ে এসে সেটি দিচ্ছি ৯ টাকায়। সব ট্যাক্স মাফ করে দিয়ে, মানুষ যেন সহজে গ্যাস কিনতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপরও আন্দোলন। একটা মজার ব্যাপার আছে, বাম আর ডান মিলে গেছে।

আমাদের ছেলেরা খেলেছে, সেটাই কম কী : চলতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ খেলায় যথেষ্ট উন্নতি করেছে। বিশ্বকাপে চারটা দেশ সেমিফাইনালে উঠেছে। তাই বলে কী বাকিরা খারাপ খেলেছে? আমরা নিজেরাই নিজেদের ছোট করি কেন? জাঁদরেল দলের সঙ্গে আমাদের ছেলেরা খেলেছে, সেটা কম কী?

ধর্ষণ প্রতিরোধে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান : ধর্ষণ প্রতিরোধে পুরুষদের সোচ্চার হতে বললেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, কেবল নারীরাই চিৎকার করে যাবে নাকি? এ ব্যাপারে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে যা যা করার দরকার বা আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার হলে সরকার তাই করবে। ধর্ষকদের শাস্তি দিতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, সরকার ধর্ষণ রোধে আরো কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে কি না? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ধর্ষণ সব সময় সব দেশে আছে। তবে এখন মেয়েরা সাহস করে কথাটা বলে। একটা সময় সামাজিক লজ্জার কারণে বলতে পারত না।

এর আগে বেশি মুনাফার আশায় পুঁজিবাজার থেকে আয়ের পুরোটাই বিনিয়োগ না করতে বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীর একটি হোটেলে ‘রিজিওনাল সেমিনার অন ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট প্রোটেকশন’ শীর্ষক চার দিনের আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তিনি এ পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই সেমিনারে জাপান, নেপাল, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ নয়টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন।

বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তাদের সচেতন হওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীরাই হলো বাজারের মূল চালিকাশক্তি। তাই তাদের সচেতনতার বিষয়টি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ার ক্ষেত্রে অন্যতম পূর্বশর্ত। জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করলে একদিকে যেমন প্রত্যেকের বিনিয়োগ ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ে, অন্যদিকে নিশ্চিত হয় পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা। অনুষ্ঠানে এডিবির আবাসিক প্রতিনিধি মনমোহন প্রকাশ এবং বিএসইসি চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, বিদেশ সফর থেকে ফিরে প্রতিবারই সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ হাসিনা। পাঁচ দিনের সফরে গত ১ জুলাই চীনের ডালিয়ানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে পাঁচটি চুক্তি, তিনটি সমঝোতা স্মারক ও একটি লেটার অব এক্সচেঞ্জে সই হয়। সফর শেষে শনিবার দুপুরে দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী।

 

 

"